প্রবন্ধ: - স্ত্রী জাতির অবনতি
 👩👩লেখিকা :-  বেগম রোকেয়া 

👉👉     আপনারা কি কোন দিন আপনাদের দুর্দ্দশার বিষয় চিন্তা করিয়া দেখিয়াছেন? এই বিংশ শতাব্দীর সভ্যজগতে আমরা কি? দাসী! পৃথিবী হইতে দাস ব্যবসায় উঠিয়া গিয়াছে শুনিতে পাই, কিন্তু আমাদের দাসত্ব গিয়াছে কি? নাআমরা দাসী কেন?-কারণ আছে
আদিমকালের ইতিহাস কেহই জানে না বটে; তবু মনে হয় যে পুরাকালে যখন সভ্যতা ছিল না সমাজবন্ধন ছিল না, তখন আমাদের অবস্থা এরূপ ছিল নাকোন অজ্ঞাত কারণ বশতঃ মানবজাতির এক অংশ (নর) যেমন ক্রমে নানাবিষয়ে উন্নতি করিতে লাগিল, অপর অংশ (নারী) তাহার সঙ্গে সঙ্গে সেরূপ উন্নতি করিতে পারিল না বলিয়া পুরুষের সহচরী বা সহধর্মিনী না হইয়া দাসী হইয়া পড়িল
আমাদের এ বিশ্বব্যাপী অধঃপতনের কারণ কেহ বলিতে পারেন কি? সম্ভবতঃ সুযোগের অভাব ইহার প্রধান কারণস্ত্রীজাতি সুবিধা না পাইয়া সংসারের সকল প্রকার কার্য্য হইতে অবসর লইয়াছেএবং ইহাদিগকে অম ও অকর্ম্মণ্য দেখিয়া পুরুষজাতি ইহাদের সাহায্য করিতে আরম্ভ করিল! ক্রমে পুরুষ পক্ষ হইতে যতই বেশী সাহায্য পাওয়া যাইতে লাগিল, স্ত্রী-পক্ষ ততই অধিকতর অকর্ম্মণ্য হইতে লাগিলএদেশের ভিক্ষুদের সহিত আমাদের বেশ তুলনা হইতে পারেএকদিকে ধনাঢ্য দানবীরগণ ধর্ম্মোদ্দেশ্যে যতই দান করিতেছেন, অন্যদিকে ততই অধম ভিক্ষুসংখ্যা বাড়িতেছে! ক্রমে ভিক্ষাবৃত্তি অলসদের একটা উপজীবিকা হইয়া দাঁড়াইয়াছেএখন আর তাহারা ভিক্ষা গ্রহণ করাটা লজ্জাজনক বোধ করে না
🔲 ঐরূপ আমাদের আত্মাদর লোপ পাওয়ায় আমরাও অনুগ্রহ আর সঙ্কোচ বোধ করি নাসুতরাং আমরা আলস্যের,-প্রকারান্তরে পুরুষের-দাসী হইয়াছিক্রমশঃ আমাদের মন পর্যন্ত দাস (enslaved) হইয়া গিয়াছেএবং আমরা বহু কাল হইতে দাসীপনা করিতে করিতে দাসত্বে অভ্যস্ত হইয়া পড়িয়াছিএইরূপে আমাদের স্বাবলম্বন, সাহস প্রভৃতি মানসিক উচ্চবৃত্তিগুলি অনুশীলন অভাবে বারবার অঙ্কুরে বিনাশ হওয়ায় এখন আর বোধ হয় অঙ্কুরিতও হয় নাকাজেই পুরুষজাতি বলিতে সুবিধা পাইয়াছেনঃ
“The five worst maladies that afflict the female mind are : indocility, discontent, slander, jealousy and silliness … such is the stupidity of her character, that it is incumbent on her, in every particular, to distrust herself and to obey her husband.” (Japan, the Land of the Rising Sun)
(ভাবার্থ-স্ত্রীজাতির অন্তঃকরণের পাঁচটি দুরারোগ্য ব্যাধি এই-(কোন বিষয় শিক্ষার) অযোগ্যতা, অসন্তোষ, পরনিন্দা, হিংসা এবং মুর্খতা···নির্ব্বোধ স্ত্রীলোকের কর্ত্তব্য যে প্রত্যেক বিষয়ে নিজেকে অবিশ্বাস করিয়া স্বামীর আদেশ পালন করে)
তারপর কেহ বলেন অতিরঞ্জন ও মিথ্যা বচর রমণী-জিহবার অলঙ্কার!আমাদিগকে কেহ নাকেস-উল-আকেলএবং কেহ যুক্তিজ্ঞানহীন” (unreasonable) বলিয়া থাকেনআমাদের ঐ সকল দোষ আছে বলিয়া তাঁহারা আমাদিগকে হেয় জ্ঞান করিতে লাগিলেনএরূপ হওয়া স্বাভাবিকএকটা উদাহরণ দেখুনএদেশে জামাতা খুব আদরণীয়-এমনকি ডাইনীও জামাই ভালবাসেতবু ঘরজামাইয়েরসেরূপ আদর হয় নাতাই দেখা যায়, আমাদের যখন স্বাধীনতা ও অধীনতাজ্ঞান বা উন্নতি ও অবনতির যে প্রভেদ তাহা বুঝিবার সামর্থ্যটুকুও থাকিল না, তখন কাজেই তাঁহারা ভূস্বামী, গৃহস্বামী প্রভৃতি হইতে ক্রমে আমাদের স্বামীহইয়া উঠিলেন! আর আমরা ক্রমশঃ তাঁহাদের গৃহপালিত পশু পীর অন্তর্গত অথবা মূল্যবান সম্পত্তি বিশেষ হইয়া পড়িয়াছি
সভ্যতা ও সমাজবন্ধনের সৃষ্টি হইলে পর সামাজিক নিয়মগুলি অবশ্য সমাজপতিদের মনোমত হইল! ইহাও স্বাভাবিকজোর যার মুলুক তাএখন জিজ্ঞাসা করি, আমাদের অবনতির জন্য কে দোষী?
আর এই যে আমাদের অতিপ্রিয় অলঙ্কারগুলি-এগুলি দাসত্বের নিদর্শন বিশেষ! এখন ইহা সৌন্দর্য্যবর্দ্ধনের আশায় ব্যবহার করা হয় বটে; কিন্তু অনেক মান্যগণ্য ব্যক্তির মতে অলংকার দাসত্বের নিদর্শন (originally badges of slavery) ছিলতাই দেখা যায় কারগারে বন্দীগণ পায় লৌহনির্ম্মিত বেড়ী পরে, আমরা (আদরের জিনিষ হাতকড়ী স্বর্ণ বা রৌপ্য-নির্ম্মিত চুড়ি! বলা বাহুল্য, লোহার বালাও বাদ দেওয়া হয় না! কুকুরের গলে যে গলাবদ্ধ (dogcollar) দেখি, উহারই অনুকরণে বোধ হয় আমাদের জড়োয়া চিক নির্ম্মিত হইয়াছে! অশ্ব হস্তী প্রভৃতি পশু লৌহ-শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকে, সেইরূপ আমরা স্বর্ণ-শৃঙ্খলে কণ্ঠ শোভিত করিয়া মনে করি হায় পরিয়াছিগো-স্বামী বলদের নাসিকা বিদ্ধ করিয়া নাকাদড়ীপরায়, এদেশে আমাদের স্বামী আমাদের নাকে নোলকপরাইয়াছেন!! ঐ নোলক হইতেছে স্বামীর অস্তিত্বের (সধবার) নিদর্শন! অতত্রব দেখিলেন ভগিনি! আপনাদের ঐ বহুমূল্য অলঙ্কারগুলি দাসত্বের নিদর্শন ব্যতীত আর কি হইতে পারে? আবার মজা দেখুন, তাঁহার শরীরে দাসত্বের নিদর্শন যত অধিক, তিনি সমাজে ততোধিক মান্যা গণ্যা!
এই অলঙ্কারের জন্য ললনাকুলের কত আগ্রহ! যেন জীবনের সুখ সমৃদ্ধি উহারই উপর নির্ভর করে! তাই দরিদ্রা! কামিনীগণ স্বর্ণরোপ্যের হাতকড়ী না পাইয়া কাচের চুড়ি পরিয়া দাসী-জীন সার্থক করেযে (বিধবা) চুড়ি পরিতে অধিকারিণী নহে, তাহার মত হতভাগিনী যেন এ জগতে আর নাই! অভ্যাসের কি অপার মাহিমা! দাসত্বে অভ্যাস হইয়াছে বলিয়া দাসত্বসূচত গহনাও ভাল লাগেঅহিফেন তিক্ত হইলেও আফিংচির অতি প্রিয় সামগ্রীমাদক দ্রব্যে যতই সর্ব্বনাশ হউক না কেন, মাতাল তাহা ছাড়িতে চাহে নাসেইরূপ আমরা অঙ্গে দাসত্বের নিদর্শন ধারণ করিয়াও আপনাকে গৌরবান্বিতা মনে করি-গর্ব্বে স্ফীতা হই!
অলঙ্কার সম্বন্ধে যাহা বলিলাম, তাহাতে কোন কোন ভগ্নী আমাকে পুরুষপক্ষেরই গুপ্তচর মনে করিতে পারেনঅর্থাৎ ভাবিলেন যে, আমি পুরুষদের টাকা স্বর্ণকারের হস্ত হইতে রক্ষা করিবার জন্য হয়ত এরূপ কৌশলে ভগ্নীদিগকে অলঙ্কারে বীতশ্রদ্ধ করিতে চেষ্টা করিতেছিকিন্তু তাহা নয়, আমি আপনাদের জন্যই দুকথা বলিতে চাইযদি অলঙ্কারের উদ্দেশ্য পুরুষদের টাকার শ্রাদ্ধ করাই হয়, তবে টাকার শ্রাদ্ধ করিবার অনেক উপায় আছে দুই একটি উপায় বলিয়া দিতেছি
আপনার ঐ জড়োয়া বাড়ীর আদুরে কুকুরটির কণ্ঠে পরাইবেনআপনি যখন শকটারোহণে বেড়াইতে যান, তখন সেই শকটবাহী অশ্বের গলে আপনার বহুমূল্য হার পরাইতে পারেন! বালা ও চুড়িগুলি বসিবার ঘরের পর্দ্দার কড়া (drawing room Gi curtain ring) রূপে ব্যবহার করা যাইতে পারেতবেই স্বামীনামধারী নরবরের টাকার বেশ শ্রাদ্ধ হইবে!! অলঙ্কারের মুখ্য উদ্দেশ্য ঐশ্বর্য্য দেখান বই ত নয়ঐরূপে ঐশ্বর্য্য দেখাইবেননিজের শরীরের দাসত্বের নিদর্শন ধারণ করিবেন কেন? উক্ত প্রকারে গহনার সদ্ব্যবহার করিলে প্রথম প্রথম লোকে আপনাকে পাগল বলিবে, কিন্তু তাহা গ্রাহ্য না করিলেই চলিবেএ পোড়া সংসারে কোন ভাল কাজটা বিনা কেশে সম্পাদিত হইয়াছে? “পৃথিবীর গতি আছেএই কথা বলাতে মহাত্ম গ্যালিলও (Galileo) কে বাতুলাগারে যাইতে হইয়াছিলকোন সাধুলোকটি অনায়াসে নিজ বক্তব্য বলিতে পারিয়াছেন? তাই বলি, সমাজের কথায় কর্ণপাত করিবেন নাএ জগতে ভাল কথা বা ভাল কাজের বর্ত্তমানে আদর হয় না
বাস্তবিক অলঙ্কার দাসত্বের নিদর্শন ভিন্ন আর কিছুই নহেযদি অলঙ্কারকে দাসত্বের নিদর্শন না ভাবিয়া সৌন্দর্য্যবর্দ্ধনের উপায় মনে করা যায়, তাহাই কি কম নিন্দনীয়? সৌন্দর্য্যবর্দ্ধনের চেষ্টাও কি মানসিক দুর্ব্বলতা নহে? পুরুষেরা ইহা পরাজয়ের নিদর্শন ভাবেনতাঁহারা কোন বিষয় তর্ক করিতে গেলে বলেন, “আমার কথা প্রমাণিত করিতে না পারিলে আমি চুড়ি পরিব”! কবিবর সাদী পুরুষদের উৎসাহিত করিবার জন্য বলিয়াছেন, “আয় মরদাঁ বকুশিদ্‌, জামা-এ-জানাঁ ন পুষিদ্‌”! অর্থাৎ হে বীরগণ! (জয়ী হইতে) চেষ্টা কর, রমণীর পোষাক পরিও নাআমাদের পোষাক পরিলে তাহাদের অপমান হয়! দেখা যাউক সে পোষকটা কি,-কাপড় ত তাঁহাদের ও আমাদের প্রায় একই প্রকারএকখণ্ড ধূতি ও একখণ্ড সাড়ির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে কিছুমাত্র তারতম্য আছে কি? যে দেশে পুরুষ পা-জামা পরে, সে দেশে নারীও পা-জামা পরে“Ladies’s jacket” শুনা যায়, “Gentlemen’s jacket” ও শুনিতে পাই! তবে জামা-এ-জানাঁবলিলে কাপড় না বুঝাইয়া সম্ভবতঃ রমণীসুলভ দুর্ব্বলতা বুঝায়
পুরুষজাতি বলেন যে, তাঁহার আমাদিগকে বুকের ভিতর বুক পাতিয়া বুক দিয়া ঢাকিয়ারাখিয়াছেন, এবং এরূপ সোহাগ আমরা সংসারে পাইব না বলিয়া ভয় প্রদর্শন করিয়া থাকেনআমরা তাই সোহাগে গলিয়া-ঢলিয়া বহিয়া যাইতেছি! ফলতঃ তাঁহারা যে অনুগ্রহ করিতেছেন, তাহাতেই আমাদের সর্ব্বনাশ হইতেছেআমাদিগকে তাঁহারা হৃদয়-পিঞ্জরে আবদ্ধ করিয়া জ্ঞান-সূর্যালোক ও বিশুদ্ধ বায়ু হইতে বঞ্চিতা রাখিয়াছেন, তাহাতেই আমরা ক্রমশঃ মরিতেছিতাঁহারা আরও বলেন, “তাহাদের সুখের সামগ্রী, আমরা মাথায় বহিয়া আনিয়া দিব-আমরা থাকিতে তাহারা দুঃখ সহ্য করিবে কেন?” আমরা ঐ শ্রেণীর বক্তাকে তাঁহাদের অনুগ্রহপূর্ণ উক্তির জন্য ধন্যবাদ দিই; কিন্তুু ভ্রাতঃ! পোড়া সংসারটা কেবল কবির সুখময়ী কল্পনা নহে-ইহা জটিল কুটিল কঠোর সংসার! সত্য বস্তু-কবিতা নহেঃ
কাব্য উপন্যাস নহে-এ মম জীবন,
নাট্যশালা নহে-ইহা প্রকৃত ভবন”-
তাই যা কিছু মুস্কিল!! নতুবা আপনাদের কৃপায় আমাদের কোন অভাব হইত নাবঙ্গবালা আপনাদের কল্পিত বর্ণনা অনুসারে ক্ষীণাঙ্গী, কোমলাঙ্গী, অবলা, ভয়-বিহবলা-ইত্যাদি হইতে হইতে ক্রমে সূক্ষ্ম শরীর (Aerial body) প্রাপ্ত হইয়া বাস্পরূপে অনায়াসে আকাশে বিলীন হইতে পারিতেন!! কিন্তু প্রকৃত অবস্থা তদ্রুপ সুখের নহে; তাই এখন মিনতি করিয়া বলিতে চাইঃ
অনুগ্রহ করে এই কর, অনুগ্রহ কর না মোদের
বাস্তবিক অত্যধিক যত্নে অনেক বস্তু নষ্ট হয়যে কাপড় বহু যত্নে বন্ধ করিয়া রাখা যায়, তাহা উইএর ভোগ্য হয়কবি বেশ বলিয়াছেনঃ
কেন নিবে গেল বাতি?
আমি অধিক যতনে ঢেকেছিনু তারে,
জাগিয়া বাসর রাতি,
তাই নিবে গেল বাতি
সুতরাং দেখা যায়, তাঁহাদের অধিক যত্নই আমাদের সর্ব্বনাশের কারণ
বিপৎসঙ্কুল সংসার হইতে সর্ব্বদা সুরতিা আছি বলিয়া আমরা সাহস, ভরসা, বল একেবারে হারাইয়াছিআত্মনির্ভর ছাড়িয়া স্বামীদের নিতান্ত মুখাপেক্ষী হইয়া পড়িয়াছিসামান্য হইতে সামান্যতর বিপদে পড়িলে আমরা গৃহকোণে লুকাইয়া গগনভেদী আর্ত্তনাদে রোদন করিয়া থাকি!! ভ্রাতৃমহোদয়গণ আবার আমাদের নাকি কান্নারকথা তুলিয়া কেমন বিদ্রূপ করেন, তাহা কে না জানে? আর সে বিদ্রূপের নীরবে সহ্য করিআমরা কেমন শোচনীয়রূপে ভীরু হইয়া পড়িয়াছি, <তাহা ভাবিলে ঘৃণায় লজ্জায় মৃতপ্রায় হই
ব্যাঘ্র ভল্লুক ও দূরে থাকুক, আরসুলা জলৌকা প্রভৃতি কীট পতঙ্গ দেখিয়া আমরা ভীতিবিহবলা হই! এমনকি অনেকে মূর্চ্ছিতা হন! একটি ৯/১০ বৎসরের বালক বোতলে আবদ্ধ একটি জলৌকা লইয়া বাড়ীশুদ্ধ স্ত্রীলোকদের ভীতি উৎপাদন করিয়া আমোদ ভোগ করেঅবলাগণ চীৎকার দৌড়িতে থাকেন, আর বালকটি সহাস্যে বোতল হস্তে তাঁহাদের পশ্চাৎ ধাবিত হয়এমন তামাসা আপনারা দেখেন নাই কি? আমি দেখিয়াছি-আর সে কথা ভাবিয়া ঘৃণায় লজ্জায় মরমে মরিতেছিসত্য কথা বলিতে কি, সে সময় বরং আমোদ বোধ করিয়াছিলাম; কিন্তু এখন সে কথা ভাবিলে শোণিত উত্তপ্ত হয়হায়! আমরা শারীরিক বল, মানসিক সাহস, সব কাহার চরণে উৎসর্গ করিয়াছি? আর এই দারুণ শোচনীয় অবস্থা চিন্তা করিবার শক্তিও আমাদের নাই
ভীরুতার চিত্র ত দেখাইলাম, এখন শারীরিক দুর্ব্বলতার চিত্র দেখাইবআমরা এমন জড় অচেতন পদার্থহইয়া গিয়াছি যে, তাঁহাদের গৃহসজ্জা (drawing room এর ornament) বই আর কিছুই নহিপাঠিকা! আপনি কখন বেহারের কোন ধনী মুসলমান ঘরের বউ-ঝী নামধেয় জড়পদার্থ দেখিয়াছেন কি? একটি বধূবেগম সাহেবার প্রতিকৃতি দেখাইইহাকে কোন প্রসিদ্ধ যাদুঘরে (museum এ) বসাইয়অ রাখিলে রমণীজাতির প্রতি উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করা হইতএকটা অন্ধকার কক্ষে দুইটি মাত্র দ্বার আছে, তাহার একটি রুদ্ধ এবং একটি মুক্ত থাকেসুতরাং সেখানে (পর্দার অনুরোধে?) বিশুদ্ধ বায়ু ও সূর্য্যরশ্মির প্রবেশ নিষেধঐ কুঠরীতে পর্য্যঙ্কের পার্শ্বে যে রক্তবর্ণ বানাত মণ্ডিত তক্তপোষ আছে, তাহার উপর বহুবিধ স্বর্ণাঙ্কারে বিভূষিতা, তাম্বুলরাগে রঞ্জিতাধরা, প্রসন্নাননা যে জড় পুত্তলিকা দেখিতেছেন, উহাই দুলহিনবেগম (অর্থাৎ বেগমের পুত্রবধূ)ইহার সর্ব্বাঙ্গে ১০২৪০ টাকার অলঙ্কার! শরীরের কোন অংশে কত ভরি সোণা বিরাজমান, তাহা সুস্পষ্টরূপে বলিয়া দেওয়া আবশ্যক মনে করি
মাথায় (সিঁথির অলঙ্কার) অর্দ্ধ সের (৪০ ভরি)
কর্ণে কিঞ্চিৎ অধিক এর পোয়া (২৫ ভরি)
কণ্ঠে দেড় সের (১২০ তোলা)
সুকোমল বাহুলতায় প্রায় দুই সের (১৫০ ভরি)
কটিদেশে প্রায় তিন পোয়া (৬৫ ভরি)
চরণযুগলে ঠিক তিন সের (২৪০ ভরি) স্বর্ণের বোঝা!!
বেগমের নাকে যে নথ দুলিতেছে, উহার ব্যাস সার্দ্ধ চারি ইঞ্চি! পরিহিত পা-জামা বেচারা সলমা চুমকির কারুকার্য্য ও বিবিধ প্রকারের জরির (গোটা পাট্রার) ভারে অবরত! আর পা-জামা ও দোপাট্রার (চাদরের) ভারে বেচারী বধূ ক্লান্ত! ঐরূপ আট সের স্বর্ণের বোঝা লইয়া নড়াচড়া অসম্ভব, সুতরাং হতভাগী বধূবেগম জড়পদার্থ না হইয়া কি করিবেন? সর্ব্বদাই তাঁহার মাথা ধরে; ইহার কারণ ত্রিবিধ-
(১) সুচিক্কণ পাটী বসাইয়া কষিয়া কেশবিন্যাস, (২) বেণী ও সিঁথির উপর অলঙ্কারের বোঝা, (৩) অর্দ্ধেক মাথায় আটা সংযোগে আফশাঁ (রৌপ্যচূর্ণ) ও চুমকি বসান হইয়াছে; ভ্রযুগ চুমকি দ্বারা আচ্ছাদিতএবং কপালে রাঙ্গের বর্ণের চাঁদ ও তারা আটা সংযোগে বসান হইয়াছেশরীর যেমন জড়পিণ্ড, মন ততোধিক জড়
এই প্রকার জড়পিণ্ড হইয়া জীবন ধারণ করা বিড়ম্বনা মাত্রকারণ কোনরূপ শারীরিক পরিশ্রম না করায় বেগমের স্বাস্থ্য একেবারে মাটী হয়কক্ষ হইতে কক্ষান্তরে যাইতে তাঁহার চরণদ্বয় শ্রান্ত ক্লান্ত ও ব্যথিত হয়বাহুদ্বয় সম্পূর্ণ অকর্ম্মণ্যঅজীর্ণ ক্ষুধামান্দ্য প্রভৃতি রোগ তাঁহার চিরসহচরশরীরে স্ফূর্ত্তি না থাকিলে মনেও স্ফূর্ত্তি থাকে নাসুতরাং ইহাদের মন এবং মস্তিঙ্ক উভয়ই চিররোগীএমন স্বাস্থ্য লইয়া চিররোগী জীবন বহন করা কেমন কষ্টকর তাহা সকলেই বুঝিতে পারেন
ঐ চিত্র দেখিলে কি মনে হয়? আমরা নিজের ও অপরের অবস্থা দেখিয়া শুনিয়া চিন্তা করিলে যে শিক্ষালাভ করি, ইহাই প্রকৃত ধর্ম্মোপদেশসময় সময় আমরা পাখী শাখী হইতে যে সদুপদেশ ও জ্ঞানলাভ করি, তাহা পুঁথিগত বিদ্যার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠএকটি আতার পতন দর্শনে মহাত্মা নিউটন যে জ্ঞানলাভ করিয়াছিলেন, সে জ্ঞান তৎকালীন কোন পুস্তকে ছিল নাঐ বধূবেগমের অবস্থা চিন্তা করিতে গিয়া আমি আমাদের সামাজিক অবস্থার এই চিত্র আঁকিতে সম হইলাম! যাহা হউক, আমি উক্ত বধূবেগমের জন্য বড় দুঃখিত হইলাম, ভাবিলাম, “অভাগীর ইহলোক পরলোক-উভয়ই নষ্টযদি ঈশ্বর হিসাব নিকাশ লয়েন যে, “তোমার মন, মস্তিঙ্ক, চক্ষু প্রভৃতির কি সদ্ব্যবহার করিয়াছ?” তাহার উত্তরে বেগম কি বলিবেন? আমি তখন সেই বাড়ীর একটি মেয়েকে বলিলাম, “তুমি যে হস্তপদদ্বারা কোন পরিশ্রম কর না, এজন্য খোদার নিকট কি জওবাবাদিহি (explanation) দিবে? সে বলিল, “আপকা কহনা ঠিক হ্যায়”-এবং সে যে সময় নষ্ট করে না, সতত চলা-ফেরা করে, আমাকে ইহাও জানাইলআমি পুনরায় বলিলাম, “শুধু ঘুরা ফেরা কথাটার উত্তরে হাসির একটা গররা উঠিলআমি কিন্তু ব্যথিত হইলাম, ভাবিলাম, “উল্টা বুঝলি রাম!কোন বিষয়ে জ্ঞানলাভ করিবার শক্তিটুকুও ইহাদের নাইআমাদের উন্নতির আশা বহুদূরে-ভরসা কেবল পতিতপাবন
আমাদের শয়নকক্ষে যেমন সূর্য্যালোক প্রবেশ করে না, তদ্রূপ মনোকক্ষেও জ্ঞানের আলোক প্রবেশ করিতে পায় নাযেহেতু আমাদের উপযুক্ত স্কুল কলেজ একপ্রকার নাইপুরুষ যত ইচ্ছা অধ্যয়ন করিতে পারেন-কিন্তু আমাদের নিমিত্ত জ্ঞানরূপ সুধাভাণ্ডারের দ্বার কখনও সম্পূর্ণ রূপে উন্মুক্ত হইবে কি? যদি কোন উদারচেতা মহাত্মা দয়া করিয়া আমাদের হাত ধরিয়া তুলিতে অগ্রসর হন, তাহা হইলে সহস্র জনে বাধা বিঘ্ন উপস্থিত করেন
সহস্র জনের বাধা ঠেলিয়া অগ্রসর হওয়া একজনের কার্য্য নহেতাই একটু আশার আলোক দীপ্তি পাইতে না পাইতে চির নিরাশার অন্ধকারে বিলীন হয়স্ত্রীশিক্ষার বিরুদ্ধে অধিকাংশ লোকের কেমন একটা কুসংস্কার আছে যে তাঁহারা স্ত্রীশিক্ষাশব্দ শুনিলেই শিক্ষার কুফলেরএকটা ভাবী বিভীষিকা দেখিয়া শিহরিয়া উঠেনঅশিক্ষিত স্ত্রীলোকের শত দোষ সমাজ অম্লানবদনে মাফ করিয়া থাকে, কিন্তু সামান্য শিক্ষাপ্রাপ্তা মহিলা দোষ না করিলেও সমাজ কোন কল্পিত দোষ শতগুণ বাড়াইয়া সে বেচারীর ঐ শিক্ষারঘাড়ে চাপাইয়া দেয় এবং শত কণ্ঠে সমস্বরে বলিয়া থাকে স্ত্রীশিক্ষাকে নমস্কার”!
আজি কালি অধিকাংশ লোকে শিক্ষাকে কেবল চাকরী লাভের পথ মনে করেমহিলাগণের চাকরী গ্রহণ অসম্ভব সুতরাং এই সকল চক্ষে স্ত্রীশিক্ষা সম্পূর্ণ অনাবশ্যক
ফাঁকা তর্কের অনুরোধে আবার কোন নেটীভ খ্রীষ্টিয়ান হয়ত মনে করিবেন যে রমণীয় জ্ঞান-পিপাসাই মানবজাতির কারল! যেহেতু শাস্ত্রে (Genesis এ) দেখা যায়, আদিমাতা হাভা (Eve) জ্ঞানবৃক্ষের ফলভক্ষণ করিয়াছিলেন বলিয়া তিনি এবং আদম উভয়েই স্বর্গচ্যুত হইয়াছেন
যাহা হউক শিক্ষার অর্থ কোন সম্প্রদায় বা জাতিবিশেষ অন্ধ-অনুকরণনহেঈশ্বর যে স্বাভাবিক জ্ঞান বা ক্ষমতা (faculty) দিয়াছেন, সেই মতাকে অনুশীলন দ্বারা বৃদ্ধি (develop) করাই শিক্ষাঐগুণের সদ্ব্যবহার করা কর্ত্তব্য এবং অপব্যবহার করা দোষঈশ্বর আমাদিগকে হস্ত পদ, কর্ণ, মনঃ এবং চিন্তাশক্তি দিয়াছেনযদি আমরা অনুশীলন দ্বারা হস্তপদ সবল করি, হস্ত, দ্বারা সৎকার্য্য করি, চক্ষুদ্বারা মনোযোগ সহকারে দর্শন (বা observe) করি, কর্ণ দ্বারা মনোযোগ পূর্ব্বক শ্রবণ করি, এবং চিন্তাশক্তি দ্বারা আরও সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করিতে শিখি-তাহাই প্রকৃত শিক্ষাআমরা কেবল পাশ করা বিদ্যাকে প্রকৃত শিক্ষা বলি নাদর্শনশক্তির বৃদ্ধি বা বিকাশ সম্বন্ধে একটা উদাহরণ দিতেছিঃ
যেখানে অশিক্ষিত চক্ষু ধূলি, কর্দ্দম ব্যতীত আর কিছুই দেখিতে পায় না, সেখানে (বিজ্ঞানের) শিক্ষিত চক্ষু অনেক মনোরম চমৎকার বস্তু দেখিতে পায়আমাদের পদদলিত করি, বিজ্ঞানবিদ্‌ তাহা বিশ্লিষ্ট করিলে নিন্মলিখিত বস্তু চতুষ্টয় প্রাপ্ত হইবেনযথা-বালুকা বিশেষণ করিলে সাদা পাথর বিশেষ (opal); কর্দ্দম পৃথক করিলে চিনে বাসন প্রস্তুত করণোপযোগী মৃত্তিকা, অথবা নীলকান্তমণি; পাথর-কয়লার কালি দ্বারা হীরক! এবং জল দ্বারা একবিন্দু নীহার! দেখিলেন, ভগিনী! সেখানে অশিক্ষিত চক্ষু কর্দ্দম দেখে, সেখানে শিক্ষিত চক্ষু হীরা মাণিক দেখে! আমরা যে এহেন চক্ষুকে চির-অন্ধ করিয়া রাখি, এজন্য খোদার নিকট কি উত্তর দিব?
মনে করুন আপনার দাসীকে আপনি একটা সম্মার্জ্জনী দিয়া বলিলেন, “যা, আমার অমুক বাড়ী পরিস্কার রাখিস্‌দাসী সম্মার্জ্জনীটা আপনার দান মনে করিয়া অতি যত্নে জরির ওয়াড়ে ঢাকিয়া উচ্চস্থানে তুলিয়া রাখিল-কোন কালে ব্যবহার করিল নাএদিকে আপনার বাড়ী ক্রমে আবর্জ্জনাপূর্ণ হইয়া বাসের অযোগ্য হইল! অতঃপর আপনি যখন দাসীর কার্য্যের হিসাব লইবেন, তখন বাড়ীর দুরবস্থা দেখিয়া আপনার মনে কি হইবে? শতমুখী ব্যবহার করিয়া বাড়ী পরিস্কার রাখিলে আপনি খুসী হইবেন, না তাহার প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করিলে সন্তুষ্ট হইবেন?
বিবেক আমাদিগকে আমাদের প্রকৃত অবনতি দেখাইয়া দিতেছে-এখন উন্নতির চেষ্টা করা আমাদের কর্ত্তব্য
আমাদের উচিত যে স্বহস্তে উন্নতির দ্বার উন্মুক্ত করিএক স্থলে আমি বলিয়াছি ভরসা কেবল পতিতপাবনকিন্তু ইহাও স্মরণ রাখা উচিত যে, ঊর্দ্ধে হস্ত উত্তোলন না করিলে পতিতপাবনও হাত ধরিয়া তুলিবেন নাঈশ্বর তাহাকেই সাহায্য করেন যে নিজে নিজের সাহায্য করে, (“God helps those that help themselves” তাই বলি আমাদের অবস্থা আমরা চিন্তা না করিলে আর কেহ আমাদের জন্য ভাবিবে নাভাবিলেও তাহাতে আমাদের ষোল আনা উপকার হইবে না
অনেকে মনে করেন যে পুরুষের উপার্জ্জিত ধন ভোগ করে বলিয়া নারী তাহার প্রভুত্ব সহ্য করেকথাটা অনেক পরিমাণে ঠিকবোধ হয় স্ত্রীজাতি প্রথমে শারীরিক শ্রমে অম হইয়া পরের উপার্জ্জিত ধনভোগে বাধ্য হয়এবং সেইজন্য তাহাকে মস্তক নত করিতে হয়কিন্তুু এখন স্ত্রীজাতির মন পর্য্যন্ত দাস (enslaved) হওয়ায় দেখা যায়, যে স্থলে দরিদ্র স্ত্রীলোকেরা সূচিকর্ম্ম বা দাসীবৃত্তি দ্বারা অর্থ উপার্জ্জন করিয়া পতি পুত্র প্রতিপালন করে, সেখানেও ঐ অকর্ম্মণ্য পুরুষেরাই স্বামীথাকেআবার যিনি স্বয়ং উপার্জ্জন না করিয়া প্রভূত সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণীকে বিবাহ করেন, তিনিও ত স্ত্রীর উপর প্রভুত্ব করেন! এবং স্ত্রী তাহাঁর প্রভুত্বে আপত্তি করেন নাইহার কারণ এই যে বহুকাল হইতে নারীহৃদয়ের উচ্চবৃত্তিগলি অঙ্কুরে বিনষ্ট হওয়ায় নারীর অন্তর, বাহির মস্তিঙ্ক, হৃদয় সবই দাসীহইয়া পড়িয়াছেএখন আর আমাদের হৃদয়ে স্বাধীনতা, ওজস্বিতা বলিয়া কোন বস্তু নাই-এবং তাহা লাভ করিবার প্রবৃত্তি পর্য্যন্ত লক্ষিত হয় না! তাই বলিতে চাইঃ
অতএব জাগ, জাগ গো ভগিনি!
প্রথমে জাগিয়া উঠা সহজ নহে, জানি; সমাজ মহা গোলযোগ বাধাইবে জানি; ভারতবাসী মুসলমান আমাদের জন্য কৎলএর (অর্থাৎ প্রাণদণ্ডের) বিধান দিবেন এবং হিন্দু চিতানল বা তুষানলের ব্যবস্থা দিবেন, জানি! (অর্থাৎ ভগ্নিদিগেরও জাগিবার ইচ্ছা নাই, জানি!) কিন্তু সমাজের কল্যাণের নিমিত্ত জাগিতে হইবেইবলিয়াছি ত কোন ভাল কাজ অনায়াসে করা যায় নাকারামুক্ত হইয়াও গ্যালিলিও বলিয়াছিলেন, কিন্তু যাহাই হউক পৃথিবী ঘুরিতেছে (“but nevertheless it (Earth) does move”)!! আমাদিগকেও ঐরূপ বিবিধ নির্যাতন সহ্য করিয়া জাগিতে হইবেএস্থলে পার্সী নারীদের একটি উদাহরণ দিতেছিনিন্মলিখিত কতিপয় পংক্তি এক খণ্ড উর্দ্দু সংবাদপত্র হইতে অনূদিত হইলঃ
এই পঞ্চাশ বর্ষের মধ্যে পার্সী মহিলাদের অনেক পরিবর্ত্তন হইয়াছেবিলাতী সভ্যতা, যাহা তাঁহারা এখন লাভ করিয়াছেন, পূর্ব্বে ইহার নাম মাত্র জানিতেন নামুসলমানদের ন্যায় তাঁহারাও পর্দায় (অর্থাৎ অন্তঃপুরে) থাকিতেনরৌদ্র ও বৃষ্টি হইতে রক্ষা পাইবার নিমিত্ত তাঁহারা ছত্র ব্যবহারে অধিকারিণী ছিলেন নাপ্রখর রবির উত্তাপ পর্দা থাকিতঅন্যের জুতাই ছত্ররূপে ব্যবহার করিতেন!! গাড়ীর ভিতর বসিলেও তাহাতে পর্দা থাকিতঅন্যের সম্মুখে স্বামীর সহিত আলাপ করিতে পাইতেন নাকিন্তু আজিকালি পার্সী মহিলাগণ পর্দা ছাড়িয়াছেন! খোলা গাড়ীতে বেড়াইয়া থাকেনঅন্যান্য পুরুষের সহিত আলাপ করেননিজেরা ব্যবসায় (দোকানদারী) করেনপ্রথমে যখন কতিপয় ভদ্রলোক তাঁহাদের স্ত্রীকে (পর্দার) বাহির করিয়াছিলেন, তখন চারিদিকে ভীষণ কলরব উঠিয়াছিলধবলকেশ বুদ্ধিমানগণ বলিয়াছেন, “পৃথিবীর ধ্বংসকাল উপস্থিত হইল  | কই পৃথিবী ও ধ্বংস হয় নাইতাই বলি, একবার একই সঙ্গে সকলে স্বাধীনতার পথে অগ্রসর হও,-সময়ে সবই সহিয়া যাইবেস্বাধীনতা অর্থে পুরুষের ন্যায় উন্নত অবস্থা বুঝিতে হইবে
এখন প্রশ্ন হইতে পারে, কি করিলে লুপ্ত রত্ন উদ্ধার হইবে? কি করিলে আমরা দেশের উপযুক্ত কন্যা হইব? প্রথমতঃ সাংসারিক জীবনের পথে পুরুষের পাশাপাশি চলিবার ইচ্ছা অথবা দৃঢ় সংকল্প আবশ্যকএবং আমরা গোলামজাতি নই, এই কথায় বিশ্বাস স্থাপন করিতে হইবে
পুরুষের সমক্ষমতা লাভের জন্য আমাদিগকে যাহা করিতে হয়, তাহাই করিবযদি এখণ স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জ্জন করিলে স্বাধীনতা লাভ হয়, তবে তাহাই করিবআবশ্যক হইলে আমরা লেডীকেরাণী হইতে আরম্ভ করিয়া লেডীম্যাজিষ্ট্রেট, লেডীর‌্যারিষ্টার, লেডীজজ-সবই হইব! পঞ্চাশ বৎসর পরে লেডী Viceroy হইয়া এ দেশের সমস্ত নারীকে রাণীকরিয়া ফেলিব!! উপার্জ্জন করিব না কেন? আমাদের কি হাত নাই, না পা নাই, না বুদ্ধি নাই? কি নাই? যে পরিশ্রম আমরা স্বামীগৃহকার্য্যে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা কি স্বাধীন ব্যবসায় করিতে পারিব না?
আমরা যদি রাজকীয় কার্য্যক্ষেত্রে প্রবেশ করিতে না পারি, তবে কৃষিক্ষেত্রে প্রবেশ করিবভারতে বর দুর্লভ হইয়াছে বলিয়া কন্যাদায়ে কাঁদিয়া মরি কেন? কন্যাগুলিকে সুশিক্ষিতা করিয়া কার্যক্ষেত্রেও পুরুষের পরিশ্রমের মূল্য বেশি, নারীর কাজ সস্তায় বিক্রয় হয়নিম্নশ্রেণীর পুরুষ যে কাজ করিলে মাসে ২ বেতন পায়, ঠিক সেই কাজে স্ত্রীলোক ১ পায়চাকরের খোরাকী মাসিক ৩ আর চাকরাণীর খোরাকী ২অবশ্য কখন কখন স্ত্রীলোককে পারিশ্রমিক বেশী পাইতেও দেখা যায়
যদি বল, আমরা দুর্ব্বলভুজা, মূর্খ, হীনবুদ্ধি নারীসে দোষ কাহার? আমাদের আমরা বুদ্ধিবৃত্তির অনুশীলন করি না বলিয়া তাহা হীনতেজ হইয়াছেএখন অনুশীলন দ্বারা বুদ্ধিবৃত্তিকে সতেজ করিবযে বাহুলতা পরিশ্রম না করায় হীনবল হইয়াছেতাহাকে খাটাইয়া সবল করিলে হয় না? এখন একবার জ্ঞানচর্চ্চা করিয়া দেখি ত এ অনুর্ব্বর মস্তিঙ্ক (dull head) সুতীক্ষ্ম হয় কি না!
পরিশেষে বলি, আমরা সমাজেরই অর্দ্ধঅঙ্গআমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কিরূপে? কোন ব্যক্তির এক পা বাঁধিয়া রাখিলে, সে খাঁড়াইয়া খোঁড়াইয়া কতদূর চলিবে? পুরুষদের স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে-একইতাঁহাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা, আমাদের লক্ষ্যও তাহাইশিশুর জন্য পিতামাতা-উভয়েরই সমান দরকারকি আধ্যাত্মিক জগতে, কি সাংসারিক জীবনের পথে-সর্ব্বত্র আমরা যাহাতে তাঁহাদের পাশাপাশি চলিতে পারি, আমাদের এরূপ গুণের আবশ্যকপ্রথমতঃ উন্নতির পথে তাঁহারা দ্রুতবেগে অগ্রসর হইলেন-আমরা পশ্চাতে পড়িয়া রহিলামএখন তাঁহারা উন্নতিরাজ্যে গিয়া দেখিতেছেন সেখানে তাঁহাদের সঙ্গিনী নাই বলিয়া তাঁহারা একাকী হইয়া আছেন! তাই আবার ফিরিয়া দাঁড়াইতে বাধ্য হইতেছেন! এবং জগতের যে সকল সমাজের পুরুষেরা সঙ্গিনীসহ অসগ্রর হইতেছেন, তাঁহারা উন্নতির চরমসীমায় উপনীত হইতে চলিয়াছেনআমাদের উচিত যে তাঁহাদের সংসারের এক গুরুতর বোঝা বিশেষ না হইয়া আমরা সহচরী সহকর্ম্মিণী সহধর্ম্মিণী ইত্যাদি হইয়া তাঁহাদের সহায়তা করিআমরা অকর্ম্মণ্য পুতুল জীবন বহন করিবার জন্য সৃষ্ট হই নাই, একথা নিশ্চিত

ভরসা করি আমাদের সুযোগ্য ভগ্নীগণ ও বিষয়ে আলোচনা করিবেনআন্দোলত না করিলেও একটু গভীরভাবে চিন্তা করিয়া দেখিবেন
কেহ কেহ বলিতে পারেন, যে, নারী নরের অধীন থাকিবে, ইহা ঈশ্বরের অভিপ্রেত-তিনি প্রথমে পুরুষ সৃষ্টি করিয়াছেন, পরে তাহার সেবা শুশ্রূষার নিমিত্ত নারীর সৃষ্টি হয়কিন্তু এস্থলে আমরা ধর্মগ্রন্থের কোন মতামত লইয়া আলোচনা করিব না-কেবল সাধারণের সহজ বুদ্ধিতে যাহা বুঝা যায়, তাহাই বলিবঅর্থাৎ স্বকীয় মত ব্যক্ত করিতেছি মাত্র
“Although the Japanese wife is considered only the first serveant of her husband, she is usually addressed in the house as the honorable mistress” “acquaintance with European customes has awakened among the more educated classes in Japan a desire to raise the position of women.” (Japan.)
ভাবার্থ-(যদিও জাপানে স্ত্রীকে স্বামীর প্রধানা সেবিকা মনে করা হয় কিন্তুু সচরাচর তাহাকে গৃহস্থিত অপর সকলে মাননীয়া গৃহিণী বলিয়া ডাকেযাহা হউক আশা ও সুখের বিষয় এই যে এখন ইউরোপীয় রীতি নীতির সহিত পরিচিত শিতি সমাজে ক্রমশঃ রমণীর অবস্থা উন্নত করিবার আকাঙ্খা জাগ্রত হইতেছে

দাসীশব্দে অনেক শ্রীমতী আপত্তি করিতে পারেনকিন্তু জিজ্ঞাসা করি, “স্বামীশব্দের অর্থ কি? দানকর্ত্তাকে দাতাবলিলে যেমন গ্রহণ কর্ত্তাকে গ্রহীতাবলিতেই হয়, সেইরূপ একজনকে স্বামী, প্রভু, ঈশ্বরবলিলে অপরকে দাসীনা বলিয়া আর কি বলিতে পারেন? যদি বলেন স্ত্রী পতি-প্রেম-পাশে আবদ্ধ হওয়ায় তাঁহার সেবিকা হইয়াছেন, তবে ওরূপ সেবাব্রত গ্রহণে অবশ্য কাহারও আপত্তি হইতে পারে নাকিন্তুু পুরুষও কি ঐরূপ পারিবারিক প্রেমে আবদ্ধ হইয়া তাহাদের প্রতিপালনরূপ সেবাব্রত গ্রহণ করেন নাই? দরিদ্রতম মজুরটিও সমস্ত দিন অনশনে পরিশ্রম করিয়া সন্ধান দুই এক আনা পয়সা পারিশ্রমিক পাইলে বাজারে গিয়া প্রথমে নিজের উদর-সেবার জন্য দুই পয়সার মুড়ি মুড়কীর শ্রাদ্ধ করে নাবরং তদ্দারা চাউল চাউল কিনিয়া পত্নীকে আনিয়া দেয়পত্নীটি রন্ধনের পর স্বামীকে যে একমুঠাঅন্নদান করে, পতি বেচারা তাহাতেই সন্তুষ্ট হয়কি চমৎকার আত্মত্যাগ! সমাজ তবু বিবাহিত পুরুষকে প্রেম-দাসনা বলিয়া স্বামী বলে কেন? হাঁ, আরও একটা প্রয়োজনীয় কথা মনে পড়িল; যে সকল দেবী স্ত্রীকে দাসীবলায় আপত্তি করেন এবং কথায় কথায় সীতা সাবিত্রীর দোহাই দেন তাঁহারা কি জানেন না যে, হিন্দুসমাজেই এমন এক (বা ততোধিক) শ্রেণীর কুলীন আছেন, যাঁহারা কন্যা ক্রয় করিয়া বিবাহ করেন? যাহাকে অর্থ দ্বারা ক্রয়করা হয়, তাহাকে ক্রীতদাসীভিন্ন আর কি বলিতে পারেন? এস্থলে বরদিগের পাশবিক্রয়ের কথা কেহ উল্লেখ করিতে পারেন বটে, কিন্তু সাধারণে বর বিক্রয় হয়এরূপ বলেন নাবিশেষতঃ বরের পাশই বিক্রয় হয়, স্বয়ং বর বিক্রীত হন নাকিন্তু কন্যা বিক্রয়ের কথায় এ যুক্তি খাটে না; কারণ অষ্টম হইতে দ্বাদশ বর্ষীয়া বালিকার এমন বিশেষ কোন গুণ বা পাশথাকে না, যাহা বিক্রয় হইতে পারেসুতরাং বালিকা স্বয়ং বিক্রীতা হয় !! একদা কোন সম্ভ্রান্ত ব্রাণীর সহিত আলাপ প্রসঙ্গে ঐ কথা উঠায়, আমি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম কেন ওঁদের সমক কুলীন কি পাওয়া যায় না যে মেয়ে কিনতে হয়?” তদুত্তরে মহিলাটি বলিয়াছিলেন, “পাওয়া যাবে না কেন? ওদের ঐ কেনা ব্যাচাই নিয়মএ যেমন ওর বোন কিনে বিয়ে করলে, আবার এর বোনকে আর একজনে কিনে বিয়ে করবে

কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের নাম বা বিশেষ কোন দোষের উল্লেখ করিবার আমাদের আদৌ ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু কুতার্কিকদিগের কুতর্ক নিবারণের নিমিত্ত এইরূপ ক্রীতদাসী ওরফে দেবীর প্রমাণ দিতে বাধ্য হইলামএজন্য আমরা নিজেই দুঃখিতকিন্তু কর্ত্তব্য অবশ্যপালনীয়
পশ্চিমাঞ্চলের জনৈক শমস্‌-উল-উলামা (জাকউল্লা সাহেব) বলেন নথ নাকেল এর (নাকাদড়ীর)ই রূপান্তর!
অলঙ্কার পরা ও উক্তরূপে টাকার শ্রাদ্ধ করা একই কথাকিন্তুু আশা করা যায় যে উক্ত প্রকারে টাকার শ্রাদ্ধ না করিয়া টাকার সদ্ব্যয় করাই অনেকে ন্যায়সঙ্গত মনে করিবেন

সেদিন (গত ৯ই এপ্রিলের) একখানা উর্দ্দু কাগজে দেখিলামঃ- তুরস্কের স্ত্রীলোকেরা সুলতান-সমীপে আবেদন করিয়াছেন যে, “চারি প্রাচীরের ভিতর থাকা ব্যতীত আমাদের আর কোন কাজ নাইআমাদিগকে অন্ততঃ এ পরিমাণ শিক্ষা দেয়া হউক, যাহার সাহায্যে যুদ্ধের সময় আমরা আপন আপন বাটী এবং নগর পুরুষদের মত বন্দুক কামান দ্বারা রক্ষা করিতে পারিতাঁহারা ঐ আবেদনে নিম্নলিখিত উপকারগুলি প্রদর্শন করিয়াছেনঃ
(১) প্রধান উপকার এই যে নগরাদি রক্ষা করিবার জন্য অনেকগুলি সৈন্য নিযুক্ত থাকায় যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য সংখ্যা কম হওয়ায় যেক্ষেতি হয়, তাহা আর হইবে না। (যেহেতু অবলাগণ নগর রক্ষা করিবেন!)
(২) সন্তান সন্ততিপূর্ণ শৈশব হইতেই যুদ্ধবিদ্যায় অভ্যস্ত হইবেপিতা মাতা উভয়ে সেপাহী হইলে শিশুগণ ভীরু, কাপুরুষ হইবে না
(৩) তাঁহারা বিশেষ এক নমুনার উর্দ্দি (Uniform) প্রস্তুুত করিবেন, যাহাতে চক্ষু ও নাসিকা ব্যতীত মুখের অবশিষ্ট অংশ এবং সর্ব্বাঙ্গ সম্পূর্ণ আবৃত থাকিবে
(৪) অবরোধপ্রথার সম্মান রক্ষার্থে এই স্থির হইয়াছে যে, অন্ততঃ তিন বৎসর পর্যন্ত প্রত্যেক পরিবারের সৈনিক পুরুষেরা আপন আপন আত্মীয় রমণীদিগকে যুদ্ধ শিক্ষা দিবেনঅতঃপর যুদ্ধশিক্ষাপ্রাপ্ত মহিলাগণ যুদ্ধশিক্ষা দিবার জন্য ঘরে ঘরে দেখা দিবেনউক্ত মহিলাগণ ইহাও লিখিয়াছেন যে, “আমরা উর্দ্দির (Uniform এর) খরচের জন্য গবর্ণমেন্টকে কষ্ট দিব নাকেবল বন্দুক এবং অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র সরকার হইতে গাইতে আশা করিদেখা যাইক, সুলতান মহোদয় এ দরখাস্তের কি উত্তর দেন
উপরোক্ত সংবাদ সত্য কি না, সেজন্য সেই পত্রিকাখানি দায়ীকিন্তু আমাদের বিশ্বাস, তুরস্ক-রমণীদের ওরূপ আকাঙ্খা হওয়া একেবারে অসম্ভব নহেইতিহাসে শুনা যায়, পূর্ব্বে তাঁহারা যুদ্ধ করিতেনএকটা যেমন তেমন মুসলমানী পুঁথির পাতা উল্টাইলেও আমরা দেখিতে পাই-(যুদ্ধ করিতে যাইয়া)-
জয়গুণ নামে বাদশাহজাদী কয়েদ হইল যদি,
আর যত আরব্য সওয়াবইত্যাদি
বলি, এদেশের যে সমাজপতিগণ লেডীকেরাণীহওয়ার প্রস্তাব শুনিলে চমকাইয়া উঠেন (shocked হন)-যাঁহারা অবলার হস্তে পুতুল সাজান ও ফুলের মালা গাঁথা ব্যতীত আর কোন শ্রমসাধ্য কার্য্যের ভার দেওয়ার কল্পনাই করিতে পারেন না, তাঁহারা ঐ লেডীযোদ্ধা হওয়ার প্রস্তাব শুনিলে কি করিবেন? মূর্চ্ছা যাইবেন না ত?
কোন কোন নথের ব্যাস ছয় ইঞ্চি এবং পরিধি ন্যূনাধিক ১৯ ইঞ্চি হয়! ওজন এক ছটাক!
পরন্তু ইউরোপীয় খৃষ্টানদের বিশ্বাস যে Eve অভিশপ্তা হইয়াছিলেন, সত্য; কিন্তু যীশুখৃষ্ট আসিয়া নারীজাতিকে সে অভিশাপ হইতে মুক্তি দিয়াছেনতাঁহারা বলেন, Through women came aurse and sin; and through women came blessing and salvation also· (ভাবার্থ-নারীর দোষে জগতে অভিশাপ ও পাপ আসিয়াছে এবং নারীর কল্যাণেই আর্শীর্ব্বাদ এবং মুক্তিও আসিয়াছে)পুরুষ খ্রীষ্টের পিতা হয় নাই, কিন্তু রমণী যীশুখ্রীষ্টের মাতৃপদ প্রাপ্তে গৌরবান্বিতা হইয়াছেন
বঙ্গীয় কোন কোন সমাজের স্ত্রীলোক যে স্বাধীনতার দাবী করিয়া থাকেন, তাহা প্রকৃত স্বাধীনতা নহে-ফাঁকা আওয়াজ মাত্র
সমাজের সমঝদার (reasonable) পুরুষেরা প্রাণদণ্ডের বিধান নাও দিতে পারেন, কিন্তু “unreasonable” অবলাসরলাগণ; (যাঁহারা যুক্তি তর্কের ধার ধারেন না, তাঁহারা) শতমুখী ও আঁইস বঁটীর ব্যবস্থা নিশ্চয় দিবেন, জানি!!
আমাদের উন্নতির ভাব বুঝাইবার জন্য পুরুষদের সমকক্ষতা বলিতেছিনচেৎ কিসের সহিত এ উন্নতির তুলনা দিব? পুরুষদের অবস্থাই আমাদের উন্নতির আদর্শএকটা পরিবারের পুত্র ও কন্যায় যে প্রকার সমকক্ষতা থাকা উচিত, আমরা তাহাই চাইযেহেতু পুরুষ সমাজের পুত্র, আমরা সমাজের কন্যা! আমরা ইহা বলি না যে কুমারের মাথায় যেমন উষ্ণীব দিয়াছেন, কুমারীর মাথায়ও তাহাই দিবেন!বরং এই বলি, কুমারের মস্তক শিরন্ত্রাণে সাজাইতে যতখানি যত্ন ও ব্যয় করা হয়, কুমারীর মাথা ঢাকিবার ওড়নাখানা প্রস্তুতের নিমিত্তও ততখানি যত্ন ব্যয় করা হউক

কিন্তু আমাদিগকে তাহা করিতে হইবে কেন? কৃষক প্রজা থাকিতে জমীদার কাঁধে লাঙ্গল লইবেন কেন? শুধু রাজার চাকরী ছাড়া আর কিছু উচ্চদরের কার্য্য কি আমরা করিতে পারি না? কেরাণী ইত্যাদির কথা কেবল উদাহরণ স্বরূপ বলা হইলযেমন স্বর্গের বর্ণনায় বলিতে হয়-সেখানে শীত নাই,-গ্রীস্ম নাই, কেবল চিরবসন্ত বিরাজমান থাকেস্বর্গোদ্যানে মরকত লতিকায় হীরক-প্রসূন ফোটে!! তাই আমাদের উচ্চ আশা বুঝাইবার নিমিত্ত লেডীভাইসরয় হইবার কথা না বলিলে কিসের সহিত আমাদের সে উচ্চদরের কার্য্যের উপমা দিব?

আবার ইহাও বলি, লেডীকেরাণী হওয়ার কথা কেবল বঙ্গদেশে যেমন shocking বোধ হয়, সেরূপ অন্যত্র বোধ হয় নাআমেরিকায় লেডীকেরাণী বা লেডীব্যারিষ্টার প্রভৃতি বিরল নহেএবং এমন একদিনও ছিল, যখন অন্যান্য দেশের মুসলমানসমাজে স্ত্রীকবি, স্ত্রীদার্শনিক, স্ত্রীঐতিহাসিক, স্ত্রীবৈজ্ঞানিক, স্ত্রীবক্তা, স্ত্রীচিকিৎসক, স্ত্রীরাজনীতিবিদ্‌প্রভৃতি কিছুরই অভাব ছিল নাকেবল বঙ্গীয় মোসলেমসমাজে ওরূপ রমণীরত্ন নাই