উপন্যাস :-- রাজর্ষি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রথম সংস্করণ ১২৯৩
দ্বিতীয় সংস্করণ ১৩০৬
বিশ্বভারতী কর্তৃক তৃতীয় সংস্করণ ১৩৩১
পুনৰ্বমুদ্রণ ১৩৩৮, ১৩৪০, ১৩৪৪
রবীন্দ্র-রচনাবলী সংস্করণ ১৩৪৬, ১৩৪৭
পুনৰ্বমুদ্রণ চৈত্র ১৩৪৭, ভ্রাবণ ১৩৫১, অগ্রহায়ণ ১৩৫২
পৌষ ১৩৫৪, মাঘ ১৩৫৮, অগ্রহায়ণ ১৩৬১, বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ
জ্যৈষ্ঠ ১৩৬৬, বৈশাখ ১৩৬৭, বৈশাখ ১৩৬৮
o পৌষ ১৩৬৮ : ১৮৮৩ শকাব্দ
দ্বিতীয় সংস্করণ ১৩০৬
বিশ্বভারতী কর্তৃক তৃতীয় সংস্করণ ১৩৩১
পুনৰ্বমুদ্রণ ১৩৩৮, ১৩৪০, ১৩৪৪
রবীন্দ্র-রচনাবলী সংস্করণ ১৩৪৬, ১৩৪৭
পুনৰ্বমুদ্রণ চৈত্র ১৩৪৭, ভ্রাবণ ১৩৫১, অগ্রহায়ণ ১৩৫২
পৌষ ১৩৫৪, মাঘ ১৩৫৮, অগ্রহায়ণ ১৩৬১, বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ
জ্যৈষ্ঠ ১৩৬৬, বৈশাখ ১৩৬৭, বৈশাখ ১৩৬৮
o পৌষ ১৩৬৮ : ১৮৮৩ শকাব্দ
রাজা ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা
করিলেন,”তোমার নাম কী?”
ছেলেটি বড়ো বড়ো চোখ
মেলিয়া দিদির মুখের দিকে চাহিয়া রহিল, কিছু উত্তর করিল না।
হাসি তাহার গায়ে হাত
দিয়া কহিল, “বল্-না ভাই, আমার নাম তাতা।”
ছেলেটি তাহার অতি ছোটো
দুইখানি ঠোঁট একটুখানি খুলিয়া গম্ভীরভাবে দিদির কথার প্রতিধ্বনির মতো বলিল, “আমার নাম তাতা।”
বলিয়া দিদির কাপড় আরও
শক্ত করিয়া ধরিল।
হাসি রাজাকে বুঝাইয়া
বলিল, “ও কিনা ছেলেমানুষ, তাই ওকে সকলে তাতা বলে।”
ছোটো ভাইটির দিকে মুখ
ফিরাইয়া কহিল, “আচ্ছা, বল্ দেখি মন্দির।”
ছেলেটি দিদির মুখের দিকে
চাহিয়া কহিল, “লদন্দ।”
হাসি হাসিয়া উঠিয়া কহিল, “তাতা মন্দির বলিতে পারে
না, বলে লদন্দ।– আচ্ছা, বল্ দেখি কড়াই।” ছেলেটি গম্ভীর হইয়া
বলিল, “বলাই।” হাসি আবার হাসিয়া
উঠিয়া কহিল, “তাতা আমাদের কড়াই বলিতে পারে না, বলে বলাই।” বলিয়া তাতাকে ধরিয়া
চুমো খাইয়া খাইয়া অস্থির করিয়া দিল।
তাতা সহসা দিদির এত হাসি
ও এত আদরের কোনোই কারণ খুঁজিয়া পাইল না, সে কেবল মস্ত চোখ
মেলিয়া চাহিয়া রহিল।বাস্তবিকই মন্দির এবং কড়াই শব্দ উচ্চারণ
সম্বন্ধে তাতার সম্পূর্ণ ত্রুটি ছিল, ইহা অস্বীকার করা যায়
না; তাতার বয়সে হাসি মন্দিরকে কখনোই লদন্দ বলিত না, সে মন্দিরকে বলিত পালু, আর সে কড়াইকে বলাই বলিত
কিনা জানি না কিন্তু কড়িকে বলিত ঘয়ি, সুতরাং তাতার এরূপ
বিচিত্র উচ্চারণ শুনিয়া তাহার যে অত্যন্ত হাসি পাইবে, তাহাতে আর আশ্চর্য কী। তাতা সম্বন্ধে নানা ঘটনা সে রাজাকে বলিতে লাগিল। একবার একজন বুড়োমানুষ কম্বল জড়াইয়া
আসিয়াছিল, তাতা তাহাকে ভাল্লুক বলিয়াছিল, এমনি তাতার মন্দবুদ্ধি। আর- একবার তাতা গাছের আতাফলগুলিকে পাখি মনে
করিয়া মোটা মোটা ছোটো দুটি হাতে তালি দিয়া তাহাদিগকে উড়াইয়া দিবার চেষ্টা
করিয়াছিল। তাতা যে হাসির চেয়ে
অনেক ছেলেমানুষ, ইহা তাতার দিদি বিস্তর উদাহরণ দ্বারা সম্পূর্ণরূপে প্রমাণ করিয়া
দিল। তাতা নিজের বুদ্ধির
পরিচয়ের কথা সম্পূর্ণ অবিচলিতচিত্তে শুনিতেছিল, যতটুকু বুঝিতে পারিল
তাহাতে ক্ষোভের কারণ কিছুই দেখিতে পাইল না। এইরূপে সেদিনকার সকালে ফুল তোলা শেষ হইল। ছোটো মেয়েটির আঁচল ভরিয়া যখন ফুল দিলেন তখন
রাজার মনে হইল, যেন তাঁহার পূজা শেষ হইল; এই দুইটি সরল প্রাণের
স্নেহের দৃশ্য দেখিয়া, এই পবিত্র হৃদয়ের আশ মিটাইয়া ফুল তুলিয়া দিয়া, তাঁহার যেন দেবপূজার কাজ
হইল।
তাহার পরদিন হইতে ঘুম
ভাঙিলে সূর্য উঠিলেও রাজার প্রভাত হইত না, ছোটো দুটি ভাইবোনের মুখ
দেখিলে তবে তাঁহার প্রভাত হইত। প্রতিদিন তাহাদিগকে ফুল তুলিয়া দিয়া তবে তিনি
স্নান করিতেন; দুই ভাইবোনে ঘাটে বসিয়া তাঁহার স্নান দেখিত। যেদিন সকালে এই দুটি ছেলেমেয়ে না আসিত, সেদিন তাঁহার
সন্ধ্যা-আহ্নিক যেন সম্পূর্ণ হইত না।
হাসি ও তাতার বাপ মা কেহ
নাই। কেবল একটি কাকা আছে। কাকার নাম কেদারেশ্বর। এই দুটি ছেলেমেয়েই তাহার জীবনের একমাত্র সুখ ও
সম্বল।
.................................
............... To be continue
FOR MORE ↓




0 Comments