রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ই মে, ১৮৬১ - ৭ই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ই মে, ১৮৬১ - ৭ই আগস্ট, ১৯৪১)[১] (২৫ বৈশাখ, ১২৬৮ - ২২ শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ)[১] ছিলেন অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক।[২] তাঁকে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মনে করা হয়।[৩]রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব, কবিগুরু ও বিশ্বকবি অভিধায় ভূষিত করা হয়।[৪] রবীন্দ্রনাথের ৫২টি কাব্যগ্রন্থ,[৫]৩৮টি নাটক,[৬] ১৩টি উপন্যাস[৭] ও ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন[৮] তাঁর জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত হয়। তাঁর সর্বমোট ৯৫টি ছোটগল্প[৯] ও ১৯১৫টি গান[১০] যথাক্রমে গল্পগুচ্ছ ও গীতবিতান সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা ৩২ খণ্ডে রবীন্দ্র রচনাবলী নামে প্রকাশিত হয়েছে।[১১]রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় পত্রসাহিত্য উনিশ খণ্ডে চিঠিপত্রও চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত।[১২] এছাড়া তিনি প্রায় দুই হাজার ছবি এঁকেছিলেন।[১৩] রবীন্দ্রনাথের রচনা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।[১৪]
জীবন
প্রথম জীবন (১৮৬১–১৯০১)
শৈশব ও কৈশোর (১৮৬১ - ১৮৭৮)
যৌবন (১৮৭৮-১৯০১)
মধ্য জীবন (১৯০১–১৯৩২)
শেষ জীবন (১৯৩২-১৯৪১)
জীবন
প্রথম জীবন (১৮৬১–১৯০১)
শৈশব ও কৈশোর (১৮৬১ - ১৮৭৮)
যৌবন (১৮৭৮-১৯০১)
মধ্য জীবন (১৯০১–১৯৩২)
শেষ জীবন (১৯৩২-১৯৪১)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ই মে, ১৮৬১ - ৭ই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ই মে, ১৮৬১ - ৭ই আগস্ট, ১৯৪১)[১] (২৫ বৈশাখ, ১২৬৮ - ২২ শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ)[১] ছিলেন অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক।[২] তাঁকে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মনে করা হয়।[৩]রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব, কবিগুরু ও বিশ্বকবি অভিধায় ভূষিত করা হয়।[৪] রবীন্দ্রনাথের ৫২টি কাব্যগ্রন্থ,[৫]৩৮টি নাটক,[৬] ১৩টি উপন্যাস[৭] ও ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন[৮] তাঁর জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত হয়। তাঁর সর্বমোট ৯৫টি ছোটগল্প[৯] ও ১৯১৫টি গান[১০] যথাক্রমে গল্পগুচ্ছ ও গীতবিতান সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা ৩২ খণ্ডে রবীন্দ্র রচনাবলী নামে প্রকাশিত হয়েছে।[১১]রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় পত্রসাহিত্য উনিশ খণ্ডে চিঠিপত্রও চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত।[১২] এছাড়া তিনি প্রায় দুই হাজার ছবি এঁকেছিলেন।[১৩] রবীন্দ্রনাথের রচনা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।[১৪]
|
১৯১৫ সালে
কলকাতায় রবীন্দ্রনাথ
|
|
জন্ম
|
৭
মে ১৮৬১
|
মৃত্যু
|
৭
আগস্ট ১৯৪১ (৮০
বছর)
জোড়াসাঁকো
ঠাকুরবাড়ি, কলকাতা, ব্রিটিশ ভারত
(অধুনা পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)
|
সমাধিস্থল
|
কলকাতা
|
ছদ্মনাম
|
ভানুসিংহ
ঠাকুর (ভণিতা)
|
পেশা
|
§
কবি
§
ঔপন্যাসিক
§
নাট্যকার
§
দার্শনিক
§
গল্পকার
|
ভাষা
|
|
নাগরিকত্ব
|
|
সময়কাল
|
|
সাহিত্য আন্দোলন
|
|
উল্লেখযোগ্য রচনাবলি
|
|
উল্লেখযোগ্য পুরস্কার
|
(১৯১৩)
|
দাম্পত্যসঙ্গী
|
|
আত্মীয়
|
|
স্বাক্ষর
|
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতার এক ধনাঢ্য ও সংস্কৃতিবান ব্রাহ্ম পিরালী ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।[১৫][১৬][১৭][১৮] বাল্যকালে প্রথাগত বিদ্যালয়-শিক্ষা
তিনি গ্রহণ করেননি; গৃহশিক্ষক
রেখে বাড়িতেই তাঁর শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।[১৯] আট বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখা শুরু
করেন।ক[›][২০] ১৮৭৪ সালে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-এ তাঁর "অভিলাষ" কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এটিই ছিল তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনা।[২১] ১৮৭৮ সালে মাত্র সতেরো বছর বয়সে
রবীন্দ্রনাথ প্রথমবার ইংল্যান্ডে যান।[২২] ১৮৮৩ সালে মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে
তাঁর বিবাহ হয়।[২২] ১৮৯০ সাল থেকে রবীন্দ্রনাথ
পূর্ববঙ্গের শিলাইদহের জমিদারি এস্টেটে বসবাস শুরু করেন।[২২] ১৯০১ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানেই
পাকাপাকিভাবে বসবাস শুরু করেন।[২৩] ১৯০২ সালে তাঁর পত্নীবিয়োগ হয়।[২৩]১৯০৫ সালে তিনি বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনেজড়িয়ে পড়েন।[২৩] ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইট
উপাধিতে ভূষিত করেন।[২৩] কিন্তু ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডেরপ্রতিবাদে তিনি সেই উপাধি ত্যাগ করেন।[২৪] ১৯২১ সালে গ্রামোন্নয়নের জন্য তিনি শ্রীনিকেতন নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।[২৫] ১৯২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠিত হয়।[২৬]দীর্ঘজীবনে তিনি বহুবার বিদেশ ভ্রমণ করেন এবং সমগ্র বিশ্বে
বিশ্বভ্রাতৃত্বের বাণী প্রচার করেন।[২৫]১৯৪১ সালে দীর্ঘ রোগভোগের পর কলকাতারপৈত্রিক বাসভবনেই তাঁর মৃত্যু হয়।[২৭]
রবীন্দ্রনাথের
কাব্যসাহিত্যের বৈশিষ্ট্য ভাবগভীরতা, গীতিধর্মিতা চিত্ররূপময়তা, অধ্যাত্মচেতনা, ঐতিহ্যপ্রীতি, প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম, স্বদেশপ্রেম, বিশ্বপ্রেম, রোম্যান্টিক সৌন্দর্যচেতনা, ভাব, ভাষা, ছন্দ ও আঙ্গিকের বৈচিত্র্য, বাস্তবচেতনা ও প্রগতিচেতনা।[২৮] রবীন্দ্রনাথের গদ্যভাষাও কাব্যিক।[২৯] ভারতের ধ্রুপদি ও লৌকিক সংস্কৃতি
এবং পাশ্চাত্য বিজ্ঞানচেতনা ও শিল্পদর্শন তাঁর রচনায় গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল।[৩০] কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধের মাধ্যমে
তিনি সমাজ,
রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি
সম্পর্কে নিজ মতামত প্রকাশ করেছিলেন।[৩১]সমাজকল্যাণের উপায় হিসেবে তিনি
গ্রামোন্নয়ন ও গ্রামের দরিদ্র মানুষ কে শিক্ষিত করে তোলার পক্ষে মতপ্রকাশ করেন।[৩২] এর পাশাপাশি সামাজিক ভেদাভেদ, অস্পৃশ্যতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ধর্মান্ধতার
বিরুদ্ধেও তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।[৩৩]রবীন্দ্রনাথের দর্শনচেতনায় ঈশ্বরের
মূল হিসেবে মানব সংসারকেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে; রবীন্দ্রনাথ দেববিগ্রহের পরিবর্তে
কর্মী অর্থাৎ মানুষ ঈশ্বরের পূজার কথা বলেছিলেন।[৩৪] সংগীত ও নৃত্যকে তিনি শিক্ষার
অপরিহার্য অঙ্গ মনে করতেন।[৩৫]রবীন্দ্রনাথের গান তাঁর অন্যতম
শ্রেষ্ঠ কীর্তি।[৩৬] তাঁর রচিত আমার সোনার বাংলা ও জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে গানদুটি যথাক্রমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ ও ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের জাতীয় সংগীত।[৩৭]
জীবন
প্রথম জীবন (১৮৬১–১৯০১)
মূল নিবন্ধ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন (১৮৬১–১৯০১)
শৈশব ও কৈশোর (১৮৬১ - ১৮৭৮)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতার জোড়াসাঁকোঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতা ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মগুরু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭–১৯০৫)[৩৮] এবং মাতা ছিলেন সারদাসুন্দরী দেবী
(১৮২৬–১৮৭৫)।[৩৯] রবীন্দ্রনাথ ছিলেন পিতামাতার
চতুর্দশ সন্তান।খ[›][৪০] জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার ছিল ব্রাহ্ম আদিধর্ম মতবাদের প্রবক্তা।[৪১][৪২] রবীন্দ্রনাথের পূর্ব পুরুষেরা খুলনা
জেলার রূপসা উপজেলা পিঠাভোগে বাস করতেন।[৪৩] ১৮৭৫ সালে মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে
রবীন্দ্রনাথের মাতৃবিয়োগ ঘটে।[২২] পিতা দেবেন্দ্রনাথ দেশভ্রমণের
নেশায় বছরের অধিকাংশ সময় কলকাতার বাইরে অতিবাহিত করতেন। তাই ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান হয়েও
রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা কেটেছিল ভৃত্যদের অনুশাসনে।[৪৪][৪৫] শৈশবে রবীন্দ্রনাথ কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারি,
নর্ম্যাল স্কুল, বেঙ্গল অ্যাকাডেমি এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট
স্কুলে কিছুদিন
করে পড়াশোনা করেছিলেন।[৪৬] কিন্তু বিদ্যালয়-শিক্ষায় অনাগ্রহী
হওয়ায় বাড়িতেই গৃহশিক্ষক রেখে তাঁর শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।[৪৭] ছেলেবেলায় জোড়াসাঁকোর বাড়িতে
অথবা বোলপুর ও পানিহাটির বাগানবাড়িতে প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে বেশি
স্বচ্ছন্দবোধ করতেন রবীন্দ্রনাথ।[৪৮][৪৯]
১৮৭৩ সালে এগারো বছর বয়সে
রবীন্দ্রনাথের উপনয়ন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।[২১] এরপর তিনি কয়েক মাসের জন্য পিতার
সঙ্গে দেশভ্রমণে বের হন।[২১]প্রথমে তাঁরা আসেন শান্তিনিকেতনে।[৫০] এরপর পাঞ্জাবের অমৃতসরে কিছুকাল কাটিয়ে শিখদেরউপাসনা পদ্ধতি পরিদর্শন করেন।[৫০] শেষে পুত্রকে নিয়ে দেবেন্দ্রনাথ
যান পাঞ্জাবেরই (অধুনা ভারতের হিমাচল প্রদেশ রাজ্যে অবস্থিত) ডালহৌসিশৈলশহরের নিকট বক্রোটায়।[৫০] এখানকার বক্রোটা বাংলোয় বসে
রবীন্দ্রনাথ পিতার কাছ থেকে সংস্কৃতব্যাকরণ, ইংরেজি, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সাধারণ বিজ্ঞান ও ইতিহাসের নিয়মিত পাঠ নিতে শুরু করেন।[৫০]দেবেন্দ্রনাথ তাঁকে বিশিষ্ট
ব্যক্তিবর্গের জীবনী, কালিদাস রচিত ধ্রুপদি সংস্কৃত কাব্য ও নাটক এবং উপনিষদ্ পাঠেও উৎসাহিত করতেন।[৫১][৫২] ১৮৭৭ সালে ভারতী পত্রিকায় তরুণ রবীন্দ্রনাথের
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা প্রকাশিত হয়। এগুলি হল মাইকেল মধুসূদনের "মেঘনাদবধ
কাব্যের সমালোচনা", ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী এবং "ভিখারিণী" ও "করুণা" নামে দুটি গল্প। এর মধ্যে ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই কবিতাগুলি রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলির অনুকরণে "ভানুসিংহ" ভণিতায় রচিত।[৫৩] রবীন্দ্রনাথের "ভিখারিণী"
গল্পটি (১৮৭৭) বাংলা সাহিত্যের প্রথম ছোটগল্প।[৫৪][৫৫]১৮৭৮ সালে প্রকাশিত হয়
রবীন্দ্রনাথের প্রথম কাব্যগ্রন্থ তথা প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ কবিকাহিনী।[৫৬]এছাড়া এই পর্বে তিনি রচনা করেছিলেন সন্ধ্যাসংগীত(১৮৮২) কাব্যগ্রন্থটি। রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতা "নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ"
এই কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত।[৫৭]
যৌবন (১৮৭৮-১৯০১)
স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর
সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ, ১৮৮৩
১৮৭৮ সালে ব্যারিস্টারি
পড়ার উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ডে যান রবীন্দ্রনাথ।[৫৮] প্রথমে তিনি ব্রাইটনের একটি পাবলিক স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন।[৫৮] ১৮৭৯ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে আইনবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। কিন্তু সাহিত্যচর্চার আকর্ষণে সেই
পড়াশোনা তিনি সমাপ্ত করতে পারেননি।[৫৮]ইংল্যান্ডে থাকাকালীন শেকসপিয়র ও অন্যান্য ইংরেজ সাহিত্যিকদের রচনার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয়
ঘটে। এই সময় তিনি বিশেষ মনোযোগ সহকারে
পাঠ করেন রিলিজিও মেদিচি, কোরিওলেনাস এবং অ্যান্টনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা।[৫৯] এই সময় তাঁর ইংল্যান্ডবাসের
অভিজ্ঞতার কথা ভারতী পত্রিকায় পত্রাকারে পাঠাতেন
রবীন্দ্রনাথ। উক্ত পত্রিকায় এই লেখাগুলি জ্যেষ্ঠভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমালোচনাসহ[৫৮] প্রকাশিত হত য়ুরোপযাত্রী কোনো বঙ্গীয় যুবকের
পত্রধারা নামে।[২২]১৮৮১ সালে সেই পত্রাবলি য়ুরোপ-প্রবাসীর পত্র নামে গ্রন্থাকারে ছাপা হয়। এটিই ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রথম
গদ্যগ্রন্থ তথা প্রথম চলিত ভাষায় লেখা গ্রন্থ।[৫৮]অবশেষে ১৮৮০ সালে প্রায় দেড় বছর
ইংল্যান্ডে কাটিয়ে কোনো ডিগ্রি না নিয়ে এবং ব্যারিস্টারি পড়া শুরু না করেই তিনি
দেশে ফিরে আসেন।[৫৮]
১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর (২৪
অগ্রহায়ণ,
১২৯০ বঙ্গাব্দ) ঠাকুরবাড়ির
অধস্তন কর্মচারী বেণীমাধব রায়চৌধুরীর কন্যা ভবতারিণীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিবাহ
সম্পন্ন হয়।[৬০] বিবাহিত জীবনে ভবতারিণীর নামকরণ
হয়েছিল মৃণালিনী দেবী (১৮৭৩–১৯০২ )।[৬০] রবীন্দ্রনাথ ও মৃণালিনীর সন্তান
ছিলেন পাঁচ জন: মাধুরীলতা (১৮৮৬–১৯১৮), রথীন্দ্রনাথ (১৮৮৮–১৯৬১), রেণুকা (১৮৯১–১৯০৩), মীরা (১৮৯৪–১৯৬৯) এবং শমীন্দ্রনাথ (১৮৯৬–১৯০৭)।[৬০]এঁদের মধ্যে অতি অল্প বয়সেই রেণুকা
ও শমীন্দ্রনাথের মৃত্যু ঘটে।[৬১]
১৮৯১ সাল থেকে পিতার আদেশে নদিয়া (নদিয়ার উক্ত অংশটি অধুনা বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলা), পাবনা ও রাজশাহী জেলা এবং উড়িষ্যারজমিদারিগুলির তদারকি শুরু করেন রবীন্দ্রনাথ।[৬২]কুষ্টিয়ার শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেছিলেন। জমিদার রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে "পদ্মা" নামে একটি বিলাসবহুল
পারিবারিক বজরায় চড়ে প্রজাবর্গের কাছে খাজনা আদায় ও আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে
যেতেন। গ্রামবাসীরাও তাঁর সম্মানে ভোজসভার আয়োজন করত।[৬৩]
১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথের
অপর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ মানসী প্রকাশিত হয়। কুড়ি থেকে ত্রিশ বছর বয়সের মধ্যে
তাঁর আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ও গীতিসংকলন প্রকাশিত হয়েছিল। এগুলি হলো প্রভাতসংগীত, শৈশবসঙ্গীত, রবিচ্ছায়া, কড়ি ও কোমল ইত্যাদি।[৬৪] ১৮৯১ থেকে ১৮৯৫ সাল পর্যন্ত নিজের
সম্পাদিত সাধনা পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু
উৎকৃষ্ট রচনা প্রকাশিত হয়। তাঁর সাহিত্যজীবনের এই পর্যায়টি তাই "সাধনা
পর্যায়" নামে পরিচিত।[৪৪] রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ গ্রন্থের প্রথম চুরাশিটি গল্পের
অর্ধেকই এই পর্যায়ের রচনা।[৫৪] এই ছোটগল্পগুলিতে তিনি বাংলার
গ্রামীণ জনজীবনের এক আবেগময় ও শ্লেষাত্মক চিত্র এঁকেছিলেন।[৬৫]
মধ্য জীবন (১৯০১–১৯৩২)
মূল নিবন্ধ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন (১৯০১–১৯৩২)
১৯১২ সালে হ্যাম্পস্টেডে
রবীন্দ্রনাথ;
বন্ধু উইলিয়াম
রোদেনস্টাইনের শিশুপুত্র জন রোদেনস্টাইন কর্তৃক গৃহীত ফটোগ্রাফ।
১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ
সপরিবারে শিলাইদহ ছেড়ে চলে আসেন বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের উপকণ্ঠে শান্তিনিকেতনে।[৬৬] এখানে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৮৮ সালে
একটি আশ্রম ও ১৮৯১ সালে একটি ব্রহ্মমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।[৬৭] আশ্রমের আম্রকুঞ্জ উদ্যানে একটি
গ্রন্থাগার নিয়ে রবীন্দ্রনাথ চালু করলেন "ব্রহ্মবিদ্যালয়"
বা
"ব্রহ্মচর্যাশ্র" নামে একটি পরীক্ষামূলক স্কুল।[৬৮] ১৯০২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মাত্র
ত্রিশ বছর বয়সে কবিপত্নী মৃণালিনী দেবী মারা যান।[৬৯] এরপর ১৯০৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর
কন্যা রেণুকা,[৭০] ১৯০৫ সালের ১৯ জানুয়ারি পিতা
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর[৭১] ও ১৯০৭ সালের ২৩ নভেম্বর কনিষ্ঠ
পুত্র শমীন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়।[৭১]
এসবের মধ্যেই ১৯০৫ সালে
রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন।[৭২] ১৯০৬ সালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর
জ্যেষ্ঠপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠান আধুনিক কৃষি ও গোপালন বিদ্যা
শেখার জন্য।[৭৩]১৯০৭ সালে কনিষ্ঠা জামাতা
নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কেও কৃষিবিজ্ঞান শেখার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে
পাঠিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।[৭৪]
এই সময় শান্তিনিকেতনের
ব্রহ্মবিদ্যালয়ে অর্থসংকট তীব্র হয়ে ওঠে। পাশাপাশি পুত্র ও জামাতার বিদেশে
পড়াশোনার ব্যয়ভারও রবীন্দ্রনাথকে বহন করতে হয়।[৭৪] এমতাবস্থায় রবীন্দ্রনাথ স্ত্রীর
গয়না ও পুরীর বসতবাড়িটি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন।[৭৫]
ইতোমধ্যেই অবশ্য বাংলা ও
বহির্বঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কবিখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯০১ সালে নৈবেদ্য ও ১৯০৬ সালে খেয়া কাব্যগ্রন্থের পর ১৯১০ সালে তাঁর
বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলি প্রকাশিত হয়।[৫][৭৬]১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি (ইংরেজি অনুবাদ, ১৯১২) কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি
অনুবাদের জন্য সুইডিশ অ্যাকাডেমি রবীন্দ্রনাথকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারপ্রদান করে।গ[›][৭৭] ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে 'স্যার' উপাধি (নাইটহুড) দেয়।[৭৮]
১৯২১ সালে শান্তিনিকেতনের অদূরে সুরুল গ্রামে মার্কিন কৃষি-অর্থনীতিবিদ লেনার্ড নাইট এলমহার্স্ট, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শান্তিনিকেতনের আরও কয়েকজন
শিক্ষক ও ছাত্রের সহায়তায় রবীন্দ্রনাথ "পল্লীসংগঠন কেন্দ্র" নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।[৭৯] এই সংস্থার উদ্দেশ্য ছিল কৃষির
উন্নতিসাধন,
ম্যালেরিয়া ইত্যাদি রোগ
নিবারণ,
সমবায় প্রথায় ধর্মগোলা
স্থাপন,
চিকিৎসার সুব্যবস্থা এবং
সাধারণ গ্রামবাসীদের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি করা।[৭৯] ১৯২৩ সালে রবীন্দ্রনাথ এই সংস্থার
নাম পরিবর্তন করে রাখেন "শ্রীনিকেতন"।[৮০] শ্রীনিকেতন ছিল মহাত্মা গান্ধীর প্রতীক ও প্রতিবাদসর্বস্ব স্বরাজ
আন্দোলনের একটি বিকল্প ব্যবস্থা। উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীর আন্দোলনের পন্থা-বিরোধী ছিলেন।[৮১]পরবর্তীকালে দেশ ও বিদেশের একাধিক
বিশেষজ্ঞ,
দাতা ও অন্যান্য
পদাধিকারীরা শ্রীনিকেতনের জন্য আর্থিক ও অন্যান্য সাহায্য পাঠিয়েছিলেন।[৮২][৮৩]
১৯৩০-এর দশকের প্রথম ভাগে
একাধিক বক্তৃতা, গান
ও কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় সমাজের বর্ণাশ্রম প্রথা ও অস্পৃশ্যতার তীব্র
সমালোচনা করেছিলেন।[৮৪][৮৫]
শেষ জীবন (১৯৩২-১৯৪১)
মূল নিবন্ধ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন (১৯৩২–১৯৪১)
১৯৩০ সালে বার্লিনে
রবীন্দ্রনাথ
জীবনের শেষ দশকে
(১৯৩২-১৯৪১) রবীন্দ্রনাথের মোট পঞ্চাশটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।[৮৬] তাঁর এই সময়কার কাব্যগ্রন্থগুলির
মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য পুনশ্চ (১৯৩২), শেষ সপ্তক (১৯৩৫), শ্যামলী ও পত্রপুট (১৯৩৬) – এই গদ্যকবিতা সংকলন তিনটি।[৫] জীবনের এই পর্বে সাহিত্যের নানা শাখায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা
চালিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসল হলো তাঁর একাধিক গদ্যগীতিকা
ও নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা (১৯৩৬; চিত্রাঙ্গদা(১৮৯২) কাব্যনাট্যের
নৃত্যাভিনয়-উপযোগী রূপ) [৮৭], শ্যামা (১৯৩৯) ও চণ্ডালিকা (১৯৩৯) নৃত্যনাট্যত্রয়ী।[৮৮] এছাড়া রবীন্দ্রনাথ তাঁর শেষ তিনটি
উপন্যাসও (দুই বোন (১৯৩৩), মালঞ্চ (১৯৩৪) ও চার অধ্যায় (১৯৩৪)) এই পর্বে রচনা করেছিলেন।[৭]তাঁর অধিকাংশ ছবি জীবনের এই পর্বেই
আঁকা।[১৩]এর সঙ্গে সঙ্গে জীবনের শেষ বছরগুলিতে
বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর
বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধ সংকলন বিশ্বপরিচয়।[৮৯] এই গ্রন্থে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানের
আধুনিকতম সিদ্ধান্তগুলি সরল বাংলা গদ্যে লিপিবদ্ধ করেছিলেন।[৮৯] পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে তাঁর অর্জিত জ্ঞানের
প্রভাব পরিলক্ষিত হয় তাঁর কাব্যেও।[৯০] সে (১৯৩৭), তিন সঙ্গী (১৯৪০) ও গল্পসল্প (১৯৪১) গল্পসংকলন তিনটিতে তাঁর
বিজ্ঞানী চরিত্র-কেন্দ্রিক একাধিক গল্প সংকলিত হয়েছে।[৯১]
জীবনের এই পর্বে ধর্মীয়
গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্রতম প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯৩৪ সালে ব্রিটিশ বিহার প্রদেশে ভূমিকম্পে শতাধিক মানুষের মৃত্যুকে গান্ধীজি "ঈশ্বরের
রোষ" বলে অভিহিত করলে, রবীন্দ্রনাথ
গান্ধীজির এহেন বক্তব্যকে অবৈজ্ঞানিক বলে চিহ্নিত করেন এবং প্রকাশ্যে তাঁর
সমালোচনা করেন।[৯২] কলকাতার সাধারণ মানুষের আর্থিক
দুরবস্থা ও ব্রিটিশ বাংলা প্রদেশের দ্রুত আর্থসামাজিক অবক্ষয় তাঁকে বিশেষভাবে
বিচলিত করে তুলেছিল। গদ্যছন্দে রচিত একটি শত-পংক্তির কবিতায় তিনি এই ঘটনা চিত্রায়িতও
করেছিলেন।[৯৩][৯৪]
জীবনের শেষ চার বছর ছিল
তাঁর ধারাবাহিক শারীরিক অসুস্থতার সময়।[৯৫] এই সময়ের মধ্যে দুইবার অত্যন্ত
অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী থাকতে হয়েছিল তাঁকে।[৯৫]১৯৩৭ সালে একবার অচৈতন্য হয়ে গিয়ে
আশঙ্কাজনক অবস্থা হয়েছিল কবির।[৯৫] সেবার সেরে উঠলেও ১৯৪০ সালে অসুস্থ
হওয়ার পর আর তিনি সেরে উঠতে পারেননি।[৯৫] এই সময়পর্বে রচিত রবীন্দ্রনাথের
কবিতাগুলি ছিল মৃত্যুচেতনাকে কেন্দ্র করে সৃজিত কিছু অবিস্মরণীয় পংক্তিমালা।[৯৫][৯৬]মৃত্যুর সাত দিন আগে পর্যন্ত
রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টিশীল ছিলেন।[২৭] দীর্ঘ রোগভোগের পর ১৯৪১ সালে জোড়াসাঁকোর বাসভবনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর।[৯৭][৯৮]আগস্ট, ১৯৪১)[১] (২৫ বৈশাখ, ১২৬৮ - ২২ শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ)[১] ছিলেন অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক।[২] তাঁকে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মনে করা হয়।[৩]রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব, কবিগুরু ও বিশ্বকবি অভিধায় ভূষিত করা হয়।[৪] রবীন্দ্রনাথের ৫২টি কাব্যগ্রন্থ,[৫]৩৮টি নাটক,[৬] ১৩টি উপন্যাস[৭] ও ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন[৮] তাঁর জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত হয়। তাঁর সর্বমোট ৯৫টি ছোটগল্প[৯] ও ১৯১৫টি গান[১০] যথাক্রমে গল্পগুচ্ছ ও গীতবিতান সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত ও
গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা ৩২ খণ্ডে রবীন্দ্র রচনাবলী নামে প্রকাশিত হয়েছে।[১১]রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় পত্রসাহিত্য উনিশ খণ্ডে চিঠিপত্রও চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত।[১২] এছাড়া তিনি প্রায় দুই হাজার ছবি
এঁকেছিলেন।[১৩] রবীন্দ্রনাথের রচনা বিশ্বের বিভিন্ন
ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য
তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।[১৪]
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
|
|
১৯১৫ সালে
কলকাতায় রবীন্দ্রনাথ
|
|
জন্ম
|
৭
মে ১৮৬১
|
মৃত্যু
|
৭
আগস্ট ১৯৪১ (৮০
বছর)
জোড়াসাঁকো
ঠাকুরবাড়ি, কলকাতা, ব্রিটিশ ভারত
(অধুনা পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)
|
সমাধিস্থল
|
কলকাতা
|
ছদ্মনাম
|
ভানুসিংহ
ঠাকুর (ভণিতা)
|
পেশা
|
§
কবি
§
ঔপন্যাসিক
§
নাট্যকার
§
দার্শনিক
§
গল্পকার
|
ভাষা
|
|
নাগরিকত্ব
|
|
সময়কাল
|
|
সাহিত্য আন্দোলন
|
|
উল্লেখযোগ্য রচনাবলি
|
|
উল্লেখযোগ্য পুরস্কার
|
(১৯১৩)
|
দাম্পত্যসঙ্গী
|
|
আত্মীয়
|
|
স্বাক্ষর
|
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতার এক ধনাঢ্য ও সংস্কৃতিবান ব্রাহ্ম পিরালী ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।[১৫][১৬][১৭][১৮] বাল্যকালে প্রথাগত বিদ্যালয়-শিক্ষা
তিনি গ্রহণ করেননি; গৃহশিক্ষক
রেখে বাড়িতেই তাঁর শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।[১৯] আট বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখা শুরু
করেন।ক[›][২০] ১৮৭৪ সালে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-এ তাঁর "অভিলাষ" কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এটিই ছিল তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনা।[২১] ১৮৭৮ সালে মাত্র সতেরো বছর বয়সে
রবীন্দ্রনাথ প্রথমবার ইংল্যান্ডে যান।[২২] ১৮৮৩ সালে মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে
তাঁর বিবাহ হয়।[২২] ১৮৯০ সাল থেকে রবীন্দ্রনাথ
পূর্ববঙ্গের শিলাইদহের জমিদারি এস্টেটে বসবাস শুরু করেন।[২২] ১৯০১ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানেই
পাকাপাকিভাবে বসবাস শুরু করেন।[২৩] ১৯০২ সালে তাঁর পত্নীবিয়োগ হয়।[২৩]১৯০৫ সালে তিনি বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনেজড়িয়ে পড়েন।[২৩] ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইট
উপাধিতে ভূষিত করেন।[২৩] কিন্তু ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডেরপ্রতিবাদে তিনি সেই উপাধি ত্যাগ
করেন।[২৪] ১৯২১ সালে গ্রামোন্নয়নের জন্য তিনি শ্রীনিকেতন নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।[২৫] ১৯২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠিত হয়।[২৬]দীর্ঘজীবনে তিনি বহুবার বিদেশ ভ্রমণ করেন এবং সমগ্র বিশ্বে
বিশ্বভ্রাতৃত্বের বাণী প্রচার করেন।[২৫]১৯৪১ সালে দীর্ঘ রোগভোগের পর কলকাতারপৈত্রিক বাসভবনেই তাঁর মৃত্যু হয়।[২৭]
রবীন্দ্রনাথের
কাব্যসাহিত্যের বৈশিষ্ট্য ভাবগভীরতা, গীতিধর্মিতা চিত্ররূপময়তা, অধ্যাত্মচেতনা, ঐতিহ্যপ্রীতি, প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম, স্বদেশপ্রেম, বিশ্বপ্রেম, রোম্যান্টিক সৌন্দর্যচেতনা, ভাব, ভাষা, ছন্দ ও আঙ্গিকের বৈচিত্র্য, বাস্তবচেতনা ও প্রগতিচেতনা।[২৮] রবীন্দ্রনাথের গদ্যভাষাও কাব্যিক।[২৯] ভারতের ধ্রুপদি ও লৌকিক সংস্কৃতি
এবং পাশ্চাত্য বিজ্ঞানচেতনা ও শিল্পদর্শন তাঁর রচনায় গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল।[৩০] কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধের মাধ্যমে
তিনি সমাজ,
রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি
সম্পর্কে নিজ মতামত প্রকাশ করেছিলেন।[৩১]সমাজকল্যাণের উপায় হিসেবে তিনি
গ্রামোন্নয়ন ও গ্রামের দরিদ্র মানুষ কে শিক্ষিত করে তোলার পক্ষে মতপ্রকাশ করেন।[৩২] এর পাশাপাশি সামাজিক ভেদাভেদ, অস্পৃশ্যতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ধর্মান্ধতার
বিরুদ্ধেও তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।[৩৩]রবীন্দ্রনাথের দর্শনচেতনায় ঈশ্বরের
মূল হিসেবে মানব সংসারকেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে; রবীন্দ্রনাথ দেববিগ্রহের পরিবর্তে
কর্মী অর্থাৎ মানুষ ঈশ্বরের পূজার কথা বলেছিলেন।[৩৪] সংগীত ও নৃত্যকে তিনি শিক্ষার
অপরিহার্য অঙ্গ মনে করতেন।[৩৫]রবীন্দ্রনাথের গান তাঁর অন্যতম
শ্রেষ্ঠ কীর্তি।[৩৬] তাঁর রচিত আমার সোনার বাংলা ও জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে গানদুটি যথাক্রমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ ও ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের জাতীয় সংগীত।[৩৭]
জীবন
প্রথম জীবন (১৮৬১–১৯০১)
মূল নিবন্ধ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন (১৮৬১–১৯০১)
শৈশব ও কৈশোর (১৮৬১ - ১৮৭৮)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতার জোড়াসাঁকোঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতা ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মগুরু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭–১৯০৫)[৩৮] এবং মাতা ছিলেন সারদাসুন্দরী দেবী
(১৮২৬–১৮৭৫)।[৩৯] রবীন্দ্রনাথ ছিলেন পিতামাতার
চতুর্দশ সন্তান।খ[›][৪০] জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার ছিল ব্রাহ্ম আদিধর্ম মতবাদের প্রবক্তা।[৪১][৪২] রবীন্দ্রনাথের পূর্ব পুরুষেরা খুলনা
জেলার রূপসা উপজেলা পিঠাভোগে বাস করতেন।[৪৩] ১৮৭৫ সালে মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে
রবীন্দ্রনাথের মাতৃবিয়োগ ঘটে।[২২] পিতা দেবেন্দ্রনাথ দেশভ্রমণের
নেশায় বছরের অধিকাংশ সময় কলকাতার বাইরে অতিবাহিত করতেন। তাই ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান হয়েও
রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা কেটেছিল ভৃত্যদের অনুশাসনে।[৪৪][৪৫] শৈশবে রবীন্দ্রনাথ কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারি,
নর্ম্যাল স্কুল, বেঙ্গল অ্যাকাডেমি এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট
স্কুলে কিছুদিন
করে পড়াশোনা করেছিলেন।[৪৬] কিন্তু বিদ্যালয়-শিক্ষায় অনাগ্রহী
হওয়ায় বাড়িতেই গৃহশিক্ষক রেখে তাঁর শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।[৪৭] ছেলেবেলায় জোড়াসাঁকোর বাড়িতে
অথবা বোলপুর ও পানিহাটির বাগানবাড়িতে প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে বেশি
স্বচ্ছন্দবোধ করতেন রবীন্দ্রনাথ।[৪৮][৪৯]
১৮৭৩ সালে এগারো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের উপনয়ন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।[২১] এরপর তিনি কয়েক মাসের জন্য পিতার
সঙ্গে দেশভ্রমণে বের হন।[২১]প্রথমে তাঁরা আসেন শান্তিনিকেতনে।[৫০] এরপর পাঞ্জাবের অমৃতসরে কিছুকাল কাটিয়ে শিখদেরউপাসনা পদ্ধতি পরিদর্শন করেন।[৫০] শেষে পুত্রকে নিয়ে দেবেন্দ্রনাথ
যান পাঞ্জাবেরই (অধুনা ভারতের হিমাচল প্রদেশ রাজ্যে অবস্থিত) ডালহৌসিশৈলশহরের নিকট বক্রোটায়।[৫০] এখানকার বক্রোটা বাংলোয় বসে
রবীন্দ্রনাথ পিতার কাছ থেকে সংস্কৃতব্যাকরণ, ইংরেজি, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সাধারণ বিজ্ঞান ও ইতিহাসের নিয়মিত পাঠ নিতে শুরু করেন।[৫০]দেবেন্দ্রনাথ তাঁকে বিশিষ্ট
ব্যক্তিবর্গের জীবনী, কালিদাস রচিত ধ্রুপদি সংস্কৃত কাব্য ও নাটক এবং উপনিষদ্ পাঠেও উৎসাহিত করতেন।[৫১][৫২] ১৮৭৭ সালে ভারতী পত্রিকায় তরুণ রবীন্দ্রনাথের
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা প্রকাশিত হয়। এগুলি হল মাইকেল মধুসূদনের "মেঘনাদবধ
কাব্যের সমালোচনা", ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী এবং "ভিখারিণী" ও "করুণা" নামে দুটি গল্প। এর মধ্যে ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই কবিতাগুলি রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলির অনুকরণে "ভানুসিংহ" ভণিতায় রচিত।[৫৩] রবীন্দ্রনাথের "ভিখারিণী"
গল্পটি (১৮৭৭) বাংলা সাহিত্যের প্রথম ছোটগল্প।[৫৪][৫৫]১৮৭৮ সালে প্রকাশিত হয়
রবীন্দ্রনাথের প্রথম কাব্যগ্রন্থ তথা প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ কবিকাহিনী।[৫৬]এছাড়া এই পর্বে তিনি রচনা করেছিলেন সন্ধ্যাসংগীত(১৮৮২) কাব্যগ্রন্থটি। রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতা "নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ"
এই কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত।[৫৭]
যৌবন (১৮৭৮-১৯০১)
স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর
সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ, ১৮৮৩
১৮৭৮ সালে ব্যারিস্টারি
পড়ার উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ডে যান রবীন্দ্রনাথ।[৫৮] প্রথমে তিনি ব্রাইটনের একটি পাবলিক স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন।[৫৮] ১৮৭৯ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে আইনবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। কিন্তু সাহিত্যচর্চার আকর্ষণে সেই
পড়াশোনা তিনি সমাপ্ত করতে পারেননি।[৫৮]ইংল্যান্ডে থাকাকালীন শেকসপিয়র ও অন্যান্য ইংরেজ সাহিত্যিকদের রচনার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয়
ঘটে। এই সময় তিনি বিশেষ মনোযোগ সহকারে
পাঠ করেন রিলিজিও মেদিচি, কোরিওলেনাস এবং অ্যান্টনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা।[৫৯] এই সময় তাঁর ইংল্যান্ডবাসের
অভিজ্ঞতার কথা ভারতী পত্রিকায় পত্রাকারে পাঠাতেন
রবীন্দ্রনাথ। উক্ত পত্রিকায় এই লেখাগুলি জ্যেষ্ঠভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমালোচনাসহ[৫৮] প্রকাশিত হত য়ুরোপযাত্রী কোনো বঙ্গীয় যুবকের
পত্রধারা নামে।[২২]১৮৮১ সালে সেই পত্রাবলি য়ুরোপ-প্রবাসীর পত্র নামে গ্রন্থাকারে ছাপা হয়। এটিই ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রথম
গদ্যগ্রন্থ তথা প্রথম চলিত ভাষায় লেখা গ্রন্থ।[৫৮]অবশেষে ১৮৮০ সালে প্রায় দেড় বছর
ইংল্যান্ডে কাটিয়ে কোনো ডিগ্রি না নিয়ে এবং ব্যারিস্টারি পড়া শুরু না করেই তিনি
দেশে ফিরে আসেন।[৫৮]
১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর (২৪
অগ্রহায়ণ,
১২৯০ বঙ্গাব্দ) ঠাকুরবাড়ির
অধস্তন কর্মচারী বেণীমাধব রায়চৌধুরীর কন্যা ভবতারিণীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিবাহ
সম্পন্ন হয়।[৬০] বিবাহিত জীবনে ভবতারিণীর নামকরণ
হয়েছিল মৃণালিনী দেবী (১৮৭৩–১৯০২ )।[৬০] রবীন্দ্রনাথ ও মৃণালিনীর সন্তান
ছিলেন পাঁচ জন: মাধুরীলতা (১৮৮৬–১৯১৮), রথীন্দ্রনাথ (১৮৮৮–১৯৬১), রেণুকা (১৮৯১–১৯০৩), মীরা (১৮৯৪–১৯৬৯) এবং শমীন্দ্রনাথ (১৮৯৬–১৯০৭)।[৬০]এঁদের মধ্যে অতি অল্প বয়সেই রেণুকা
ও শমীন্দ্রনাথের মৃত্যু ঘটে।[৬১]
১৮৯১ সাল থেকে পিতার আদেশে নদিয়া (নদিয়ার উক্ত অংশটি অধুনা বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলা), পাবনা ও রাজশাহী জেলা এবং উড়িষ্যারজমিদারিগুলির তদারকি শুরু করেন রবীন্দ্রনাথ।[৬২]কুষ্টিয়ার শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেছিলেন। জমিদার রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে "পদ্মা" নামে একটি বিলাসবহুল
পারিবারিক বজরায় চড়ে প্রজাবর্গের কাছে খাজনা আদায় ও আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে
যেতেন। গ্রামবাসীরাও তাঁর সম্মানে ভোজসভার আয়োজন করত।[৬৩]
১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথের
অপর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ মানসী প্রকাশিত হয়। কুড়ি থেকে ত্রিশ বছর বয়সের মধ্যে
তাঁর আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ও গীতিসংকলন প্রকাশিত হয়েছিল। এগুলি হলো প্রভাতসংগীত, শৈশবসঙ্গীত, রবিচ্ছায়া, কড়ি ও কোমল ইত্যাদি।[৬৪] ১৮৯১ থেকে ১৮৯৫ সাল পর্যন্ত নিজের
সম্পাদিত সাধনা পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু
উৎকৃষ্ট রচনা প্রকাশিত হয়। তাঁর সাহিত্যজীবনের এই পর্যায়টি তাই "সাধনা
পর্যায়" নামে পরিচিত।[৪৪] রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ গ্রন্থের প্রথম চুরাশিটি গল্পের
অর্ধেকই এই পর্যায়ের রচনা।[৫৪] এই ছোটগল্পগুলিতে তিনি বাংলার
গ্রামীণ জনজীবনের এক আবেগময় ও শ্লেষাত্মক চিত্র এঁকেছিলেন।[৬৫]
মধ্য জীবন (১৯০১–১৯৩২)
মূল নিবন্ধ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন (১৯০১–১৯৩২)
১৯১২ সালে হ্যাম্পস্টেডে
রবীন্দ্রনাথ;
বন্ধু উইলিয়াম
রোদেনস্টাইনের শিশুপুত্র জন রোদেনস্টাইন কর্তৃক গৃহীত ফটোগ্রাফ।
১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ
সপরিবারে শিলাইদহ ছেড়ে চলে আসেন বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের উপকণ্ঠে শান্তিনিকেতনে।[৬৬] এখানে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৮৮ সালে
একটি আশ্রম ও ১৮৯১ সালে একটি ব্রহ্মমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।[৬৭] আশ্রমের আম্রকুঞ্জ উদ্যানে একটি
গ্রন্থাগার নিয়ে রবীন্দ্রনাথ চালু করলেন "ব্রহ্মবিদ্যালয়"
বা
"ব্রহ্মচর্যাশ্র" নামে একটি পরীক্ষামূলক স্কুল।[৬৮] ১৯০২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মাত্র
ত্রিশ বছর বয়সে কবিপত্নী মৃণালিনী দেবী মারা যান।[৬৯] এরপর ১৯০৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর
কন্যা রেণুকা,[৭০] ১৯০৫ সালের ১৯ জানুয়ারি পিতা
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর[৭১] ও ১৯০৭ সালের ২৩ নভেম্বর কনিষ্ঠ
পুত্র শমীন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়।[৭১]
এসবের মধ্যেই ১৯০৫ সালে
রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন।[৭২] ১৯০৬ সালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর
জ্যেষ্ঠপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠান আধুনিক কৃষি ও গোপালন বিদ্যা
শেখার জন্য।[৭৩]১৯০৭ সালে কনিষ্ঠা জামাতা
নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কেও কৃষিবিজ্ঞান শেখার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে
পাঠিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।[৭৪]
এই সময় শান্তিনিকেতনের
ব্রহ্মবিদ্যালয়ে অর্থসংকট তীব্র হয়ে ওঠে। পাশাপাশি পুত্র ও জামাতার বিদেশে
পড়াশোনার ব্যয়ভারও রবীন্দ্রনাথকে বহন করতে হয়।[৭৪] এমতাবস্থায় রবীন্দ্রনাথ স্ত্রীর
গয়না ও পুরীর বসতবাড়িটি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন।[৭৫]
ইতোমধ্যেই অবশ্য বাংলা ও
বহির্বঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কবিখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯০১ সালে নৈবেদ্য ও ১৯০৬ সালে খেয়া কাব্যগ্রন্থের পর ১৯১০ সালে তাঁর
বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলি প্রকাশিত হয়।[৫][৭৬]১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি (ইংরেজি অনুবাদ, ১৯১২) কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি
অনুবাদের জন্য সুইডিশ অ্যাকাডেমি রবীন্দ্রনাথকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারপ্রদান করে।গ[›][৭৭] ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে 'স্যার' উপাধি (নাইটহুড) দেয়।[৭৮]
১৯২১ সালে শান্তিনিকেতনের অদূরে সুরুল গ্রামে মার্কিন কৃষি-অর্থনীতিবিদ লেনার্ড নাইট এলমহার্স্ট, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শান্তিনিকেতনের আরও কয়েকজন
শিক্ষক ও ছাত্রের সহায়তায় রবীন্দ্রনাথ "পল্লীসংগঠন কেন্দ্র" নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।[৭৯] এই সংস্থার উদ্দেশ্য ছিল কৃষির
উন্নতিসাধন,
ম্যালেরিয়া ইত্যাদি রোগ
নিবারণ,
সমবায় প্রথায় ধর্মগোলা
স্থাপন,
চিকিৎসার সুব্যবস্থা এবং
সাধারণ গ্রামবাসীদের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি করা।[৭৯] ১৯২৩ সালে রবীন্দ্রনাথ এই সংস্থার
নাম পরিবর্তন করে রাখেন "শ্রীনিকেতন"।[৮০] শ্রীনিকেতন ছিল মহাত্মা গান্ধীর প্রতীক ও প্রতিবাদসর্বস্ব স্বরাজ
আন্দোলনের একটি বিকল্প ব্যবস্থা। উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীর আন্দোলনের পন্থা-বিরোধী ছিলেন।[৮১]পরবর্তীকালে দেশ ও বিদেশের একাধিক
বিশেষজ্ঞ,
দাতা ও অন্যান্য
পদাধিকারীরা শ্রীনিকেতনের জন্য আর্থিক ও অন্যান্য সাহায্য পাঠিয়েছিলেন।[৮২][৮৩]
১৯৩০-এর দশকের প্রথম ভাগে
একাধিক বক্তৃতা, গান
ও কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় সমাজের বর্ণাশ্রম প্রথা ও অস্পৃশ্যতার তীব্র
সমালোচনা করেছিলেন।[৮৪][৮৫]
শেষ জীবন (১৯৩২-১৯৪১)
মূল নিবন্ধ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন (১৯৩২–১৯৪১)
১৯৩০ সালে বার্লিনে
রবীন্দ্রনাথ
জীবনের শেষ দশকে
(১৯৩২-১৯৪১) রবীন্দ্রনাথের মোট পঞ্চাশটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।[৮৬] তাঁর এই সময়কার কাব্যগ্রন্থগুলির
মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য পুনশ্চ (১৯৩২), শেষ সপ্তক (১৯৩৫), শ্যামলী ও পত্রপুট (১৯৩৬) – এই গদ্যকবিতা সংকলন তিনটি।[৫] জীবনের এই পর্বে সাহিত্যের নানা শাখায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা
চালিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসল হলো তাঁর একাধিক গদ্যগীতিকা
ও নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা (১৯৩৬; চিত্রাঙ্গদা(১৮৯২) কাব্যনাট্যের
নৃত্যাভিনয়-উপযোগী রূপ) [৮৭], শ্যামা (১৯৩৯) ও চণ্ডালিকা (১৯৩৯) নৃত্যনাট্যত্রয়ী।[৮৮] এছাড়া রবীন্দ্রনাথ তাঁর শেষ তিনটি
উপন্যাসও (দুই বোন (১৯৩৩), মালঞ্চ (১৯৩৪) ও চার অধ্যায় (১৯৩৪)) এই পর্বে রচনা করেছিলেন।[৭]তাঁর অধিকাংশ ছবি জীবনের এই পর্বেই
আঁকা।[১৩]এর সঙ্গে সঙ্গে জীবনের শেষ
বছরগুলিতে বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর
বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধ সংকলন বিশ্বপরিচয়।[৮৯] এই গ্রন্থে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানের
আধুনিকতম সিদ্ধান্তগুলি সরল বাংলা গদ্যে লিপিবদ্ধ করেছিলেন।[৮৯] পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে তাঁর অর্জিত জ্ঞানের
প্রভাব পরিলক্ষিত হয় তাঁর কাব্যেও।[৯০] সে (১৯৩৭), তিন সঙ্গী (১৯৪০) ও গল্পসল্প (১৯৪১) গল্পসংকলন তিনটিতে তাঁর
বিজ্ঞানী চরিত্র-কেন্দ্রিক একাধিক গল্প সংকলিত হয়েছে।[৯১]
জীবনের এই পর্বে ধর্মীয়
গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্রতম প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯৩৪ সালে ব্রিটিশ বিহার প্রদেশে ভূমিকম্পে শতাধিক মানুষের মৃত্যুকে গান্ধীজি "ঈশ্বরের
রোষ" বলে অভিহিত করলে, রবীন্দ্রনাথ
গান্ধীজির এহেন বক্তব্যকে অবৈজ্ঞানিক বলে চিহ্নিত করেন এবং প্রকাশ্যে তাঁর
সমালোচনা করেন।[৯২] কলকাতার সাধারণ মানুষের আর্থিক
দুরবস্থা ও ব্রিটিশ বাংলা প্রদেশের দ্রুত আর্থসামাজিক অবক্ষয় তাঁকে বিশেষভাবে
বিচলিত করে তুলেছিল। গদ্যছন্দে রচিত একটি শত-পংক্তির কবিতায় তিনি এই ঘটনা চিত্রায়িতও
করেছিলেন।[৯৩][৯৪]
জীবনের শেষ চার বছর ছিল
তাঁর ধারাবাহিক শারীরিক অসুস্থতার সময়।[৯৫] এই সময়ের মধ্যে দুইবার অত্যন্ত
অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী থাকতে হয়েছিল তাঁকে।[৯৫]১৯৩৭ সালে একবার অচৈতন্য হয়ে গিয়ে
আশঙ্কাজনক অবস্থা হয়েছিল কবির।[৯৫] সেবার সেরে উঠলেও ১৯৪০ সালে অসুস্থ
হওয়ার পর আর তিনি সেরে উঠতে পারেননি।[৯৫] এই সময়পর্বে রচিত রবীন্দ্রনাথের
কবিতাগুলি ছিল মৃত্যুচেতনাকে কেন্দ্র করে সৃজিত কিছু অবিস্মরণীয় পংক্তিমালা।[৯৫][৯৬]মৃত্যুর সাত দিন আগে পর্যন্ত
রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টিশীল ছিলেন।[২৭] দীর্ঘ রোগভোগের পর ১৯৪১ সালে জোড়াসাঁকোর বাসভবনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর।[৯৭][৯৮]
Copyright
from Wikipedia









0 Comments