কবিতা   :-  জুতা আবিষ্কার

কহিলা হবু, ‘শুন গো গোবুরায়
 কালিকে আমি ভেবেছি সারা রাত্র- 
 মলিন ধূলা লাগিবে কেন পায় 
 ধরণীমাঝে চরণফেলা মাত্র! 
 তোমরা শুধু বেতন লহ বাঁটি
 রাজার কাজে কিছুই নাহি দৃষ্টি 
 আমার মাটি লাগায় মোরে মাটি
 রাজ্যে মোর একি এ অনাসৃষ্টি! 
 শীঘ্র এর করিবে প্রতিকার
 নহিলে কারো রক্ষা নাহি আর’ 

 শুনিয়া গোবু ভাবিয়া হল খুন
 দারুণ ত্রাসে ঘর্ম বহে গাত্রে 
 পণ্ডিতের হইল মুখ চুন
 পাত্রদের নিদ্রা নাহি রাত্রে 
 রান্নাঘরে নাহিকো চড়ে হাঁড়ি
 কান্নাকাটি পড়িল বাড়িমধ্যে
 অশ্রুজলে ভাসায়ে পাকা দাড়ি 
 কহিলা গোবু হবুর পাদপদ্মে
 ‘যদি না ধুলা লাগিবে তব পায়ে
 পায়ের ধুলা পাইব কী উপায়ে!’ 

 শুনিয়া রাজা ভাবিল দুলি দুলি
 কহিল শেষে, ‘কথাটা বটে সত্য— 
 কিন্তু আগে বিদায় করো ধুলি
 ভাবিয়ো পরে পদধুলির তত্ত্ব 
 ধুলাঅভাবে না পেলে পদধুলা 
 তোমরা সবে মাহিনা খাও মিথ্যে
 কেন বা তবে পুষিনু এতগুলা 
 উপাধিধরা বৈজ্ঞানিক ভৃত্যে
 আগের কাজ আগে তো তুমি সারো
 পরের কথা ভাবিয়ো পরে আরো’ 

 আঁধার দেখে রাজার কথা শুনি
 যতনভরে আনিল তবে মন্ত্রী 
 যেখানে যত আছিল জ্ঞানীগুণী 
 দেশে বিদেশে যতেক ছিল যন্ত্রী 
 বসিল সবে চশমা চোখে আঁটি
 ফুরায়ে গেল উনিশ পিপে নস্য 
 অনেক ভেবে কহিল, ‘গেলে মাটি 
 ধরায় তবে কোথায় হবে শস্য?’ 
 কহিল রাজা, ‘তাই যদি না হবে
 পণ্ডিতেরা রয়েছ কেন তবে?’ 

 সকলে মিলি যুক্তি করি শেষে 
 কিনিল ঝাঁটা সাড়ে সতেরো লক্ষ
 ঝাঁটের চোটে পথের ধুলা এসে 
 ভরিয়ে দিল রাজার মুখ বক্ষ 
 ধুলায় কেহ মেলিতে নারে চোখ
 ধুলার মেঘে পড়িল ঢাকা সূর্য 
 ধুলার বেগে কাশিয়া মরে লোক
 ধুলার মাঝে নগর হল উহ্য 
 কহিল রাজা, ‘করিতে ধুলা দূর
 জগৎ হল ধুলায় ভরপুর!’ 

 তখন বেগে ছুটিল ঝাঁকে ঝাঁক 
 মশক কাঁখে একুশ লাখ ভিস্তি 
 পুকুরে বিলে রহিল শুধু পাঁক
 নদীর জলে নাহিক চলে কিস্তি 
 জলের জীব মরিল জল বিনা
 ডাঙার প্রাণী সাঁতার করে চেষ্টা- 
 পাঁকের তলে মজিল বেচাকিনা
 সর্দিজ্বরে উজাড় হল দেশটা 
 কহিল রাজা, এমনি সব গাধা 
 ধুলারে মারি করিয়া দিল কাদা! 

 আবার সবে ডাকিল পরামর্শে
 বসিল পুন যতেক গুণবন্ত 
 ঘুরিয়া মাথা হেরিল চোখে সর্ষে
 ধুলার হায় নাহিক পায় অন্ত 
 কহিল, মহী মাদুর দিয়ে ঢাকো
 ফরাশ পাতি করিব ধুলা বন্ধ 
 কহিল কেহ, রাজারে ঘরে রাখো
 কোথাও যেন থাকে না কোনো রন্ধ্র 
 ধুলার মাঝে না যদি দেন পা 
 তা হলে পায়ে ধুলা তো লাগে না 

 কহিল রাজা, সে কথা বড়ো খাঁটি
 কিন্তু মোর হতেছে মনে সন্ধ
 মাটির ভয়ে রাজ্য হবে মাটি 
 দিবসরাতি রহিলে আমি বন্ধ 
 কহিল সবে, চামারে তবে ডাকি 
 চর্ম দিয়া মুড়িয়া দাও পৃথ্বী 
 ধূলির মহী ঝুলির মাঝে ঢাকি 
 মহীপতির রহিবে মহাকীর্তি 
 কহিল সবে, হবে সে অবহেলে
 যোগ্যমতো চামার যদি মেলে 

 রাজার চর ধাইল হেথা হোথা
 ছুটিল সবে ছাড়িয়া সব কর্ম 
 যোগ্যমতো চামার নাহি কোথা
 না মিলে তত উচিতমতো চর্ম 
 তখন ধীরে চামারকুলপতি 
 কহিল এসে ঈষৎ হেসে বৃদ্ধ
 বলিতে পারি করিলে অনুমতি
 সহজে যাহে মানস হবে সিদ্ধ 
 নিজের দুটি চরণ ঢাকো, তবে 
 ধরণী আর ঢাকিতে নাহি হবে 

 কহিল রাজা, এত কি হবে সিধে
 ভাবিয়া মল সকল দেশশুদ্ধ! 
 মন্ত্রী কহে, বেটারে শূল বিঁধে 
 কারার মাঝে করিয়া রাখো রুদ্ধ 
 রাজার পদ চর্মআবরণে 
 ঢাকিল বুড়া বসিয়া পদোপান্তে 
 মন্ত্রী কহে, আমারো ছিল মনে 
 কেমনে বেটা পেরেছে সেটা জানতে 
 সেদিন হতে চলিল জুতা পরা 
 বাঁচিল গোবু, রক্ষা পেল ধরা

======



শুধু বিঘে-দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সবই গেছে ঋণে
বাবু বলিলেন, 'বুঝেছ উপেন? এ জমি লইব কিনে'
কহিলাম আমি, 'তুমি ভূস্বামী, ভূমির অন্ত নাই -
চেয়ে দেখো মোর আছে বড়জোর মরিবার মতো ঠাঁই
শুনি রাজা কহে, 'বাপু, জানো তো হে, করেছি বাগানখানা,
পেলে দুই বিঘে প্রস্থে ও দিঘে সমান হইবে টানা -
ওটা দিতে হবে' কহিলাম তবে বক্ষে জুড়িয়া পাণি
সজল চক্ষে, 'করুন রক্ষে গরিবের ভিটেখানি
সপ্তপুরুষ যেথায় মানুষ সে মাটি সোনার বাড়া,
দৈন্যের দায়ে বেচিব সে মায়ে এমনি লক্ষ্মীছাড়া!'
আঁখি করি লাল রাজা ক্ষণকাল রহিল মৌনভাবে,
কহিলেন শেষে ক্রুর হাসি হেসে, 'আচ্ছা, সে দেখা যাবে'
পরে মাস-দেড়ে ভিটে মাটি ছেড়ে বাহির হইনু পথে -
করিল ডিক্রি, সকলই বিক্রি মিথ্যা দেনার খতে
এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি,
রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি
মনে ভাবিলাম, মোরে ভগবান রাখিবে না মোহগর্তে,
তাই লিখি দিল বিশ্বনিখিল দু বিঘার পরিবর্তে
সন্ন্যাসীবেশে ফিরি দেশে দেশে হইয়া সাধুর শিষ্য -
কত হেরিলাম মনোহর ধাম, কত মনোরম দৃশ্য
ভূধরে সাগরে বিজনে নগরে যখন যেখানে ভ্রমি
তবু নিশিদিনে ভুলিতে পারি নে সেই দুই বিঘা জমি
হাটে মাঠে বাটে এইমত কাটে বছর পনেরো-ষোলো,
একদিন শেষে ফিরিবারে দেশে বড়োই বাসনা হল।।
নমোনমো নম, সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি!
গঙ্গার তীর, স্নিগ্ধ সমীর জীবন জুড়ালে তুমি
অবারিত মাঠ, গগনললাট চুমে তব পদধুলি -
ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটো ছোটো গ্রামগুলি
পল্লবঘন আম্রকানন, রাখালের খেলাগেহ -
স্তব্ধ অতল দিঘি কালোজল নিশীথশীতলস্নেহ
বুক-ভরা-মধু বঙ্গের বধু জল লয়ে যায় ঘরে
মা বলিতে প্রাণ করে আনচান, চোখে আসে জল ভরে
দুই দিন পরে দ্বিতীয় প্রহরে প্রবেশিনু নিজগ্রামে -
কুমোরের বাড়ি দক্ষিণে ছাড়ি, রথতলা করি বামে,
রাখি হাটখোলা নন্দীর গোলা, মন্দির করি পাছে
তৃষাতুর শেষে পঁহুছিনু এসে আমার বাড়ির কাছে।।
ধিক্ ধিক্ ওরে, শত ধিক্ তোরে নিলাজ কুলটা ভূমি,
যখনি যাহার তখনি তাহার - এই কি জননী তুমি!
সে কি মনে হবে একদিন যবে ছিলে দরিদ্রমাতা
আঁচল ভরিয়া রাখিতে ধরিয়া ফলফুল শাক-পাতা!
আজ কোন্ রীতে কারে ভুলাইতে ধরেছ বিলাসবেশ -
পাঁচরঙা পাতা অঞ্চলে গাঁথা, পুষ্পে খচিত কেশ!
আমি তোর লাগি ফিরেছি বিবাগি গৃহহারা সুখহীন,
তুই হেথা বসি ওরে রাক্ষসী, হাসিয়া কাটাস দিন!
ধনীর আদরে গরব না ধরে! এতই হয়েছ ভিন্ন -
কোনোখানে লেশ নাহি অবশেষ সে দিনের কোনো চিহ্ন!
কল্যাণময়ী ছিলে তুমি অয়ী, ক্ষুধাহরা সুধারাশি
যত হাসো আজ, যত করো সাজ, ছিলে দেবী - হলে দাসী।।
বিদীর্ণহিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া চারি দিকে চেয়ে দেখি -
প্রাচীরের কাছে এখনো যে আছে সেই আমগাছ একি!
বসি তার তলে নয়নের জলে শান্ত হইল ব্যথা,
একে একে মনে উদিল স্মরণে বালককালের কথা
সেই মনে পড়ে, জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে নাহিকো ঘুম,
অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম কুড়াবার ধুম
সেই সুমধুর স্তব্ধ দুপুর, পাঠশালা-পলায়ন -
ভাবিলাম হায়, আর কি কোথায় ফিরে পাব সে জীবন
সহসা বাতাস ফেলি গেল শ্বাস শাখা দুলাইয়া গাছে,
দুটি পাকা ফল লভিল ভূতল আমার কোলের কাছে
ভাবিলাম মনে, বুঝি এতখনে আমারে চিনিল মাতা
স্নেহের সে দানে বহু সম্মানে বারেক ঠেকানু মাথা।।
হেনকালে হায় যমদূতপ্রায় কোথা হতে এল মালী
ঝুঁটিবাঁধা উড়ে সপ্তম সুরে পাড়িতে লাগিল গালি
কহিলাম তবে, 'আমি তো নীরবে দিয়েছি আমার সব -
দুটি ফল তার করি অধিকার, এত তারি কলরব'
চিনিল না মোরে, নিয়ে গেল ধরে কাঁধে তুলি লাঠিগাছ;
বাবু ছিপ হাতে পারিষদ-সাথে ধরিতেছিলেন মাছ -
শুনে বিবরণ ক্রোধে তিনি কন, 'মারিয়া করিব খুন'
বাবু যত বলে পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ
আমি কহিলাম, 'শুধু দুটি আম ভিখ মাগি মহাশয়!'
বাবু কহে হেসে, 'বেটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয়!'
আমি শুনে হাসি, আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোরে ঘটে -
তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।। 



অচল স্মৃতি আমার হৃদয়ভূমি-মাঝখানে
জাগিয়া রয়েছে নিতি
অচল ধবল শৈল-সমান
একটি অচল স্মৃতি
প্রতিদিন ঘিরি ঘিরি
সে নীরব হিমগিরি
আমার দিবস আমার রজনী আসিছে যেতেছে ফিরি
যেখানে চরণ রেখেছে সে মোর
মর্ম গভীরতম
উন্নত শির রয়েছে তুলিয়া
সকল উচ্চে মম
মোর কল্পনা শত
রঙিন মেঘের মতো
তাহারে ঘেরিয়া হাসিছে কাঁদিছে ,
সোহাগে হতেছে নত
আমার শ্যামল তরুলতাগুলি
ফুলপল্লবভারে
সরস কোমল বাহুবেষ্টনে
বাঁধিতে চাহিছে তারে
শিখর গগনলীন
দুর্গম জনহীন ,
বাসনাবিহগ একেলা সেথায়
ধাইছে রাত্রিদিন
চারি দিকে তার কত আসা-যাওয়া ,
কত গীত , কত কথা মাঝখানে শুধু ধ্যানের মতন
নিশ্চল নীরবতা
দূরে গেলে তবু , একা
সে শিখর যায় দেখা
চিত্তগগনে আঁকা থাকে তার
নিত্যনীহাররেখা




কবিতা:- বসন্ত 

অযুত বৎসর আগে হে বসন্ত, প্রথম ফাল্গুনে 
মত্ত কুতূহলী,
প্রথম যেদিন খুলি নন্দনের দক্ষিণ-দুয়ার
মর্তে এলে চলি,
অকস্মাৎ দাঁড়াইলে মানবের
কুটিরপ্রাঙ্গণে
পীতাম্বর পরি,
উতলা উত্তরী হতে উড়াইয়া উন্মাদ পবনে
মন্দারমঞ্জরী,

দলে দলে নরনারী ছুটে এল গৃহদ্বার খুলি
লয়ে বীণা বেণু
মাতিয়া পাগল নৃত্যে হাসিয়া করিল
হানাহানি
ছুঁড়ি পুষ্পরেণু
সখা, সেই অতিদূর সদ্যোজাত আদি মধুমাসে
তরুণ ধরায়
এনেছিলে যে কুসুম ডুবাইয়া তপ্ত কিরণের
স্বর্ণমদিরায়,

সেই পুরাতন সেই চিরন্তন অনন্ত প্রবীণ
নব পুষ্পরাজি
বর্ষে বর্ষে আনিয়াছতাই
লয়ে আজো পুনর্বার
সাজাইলে সাজি
তাই সে পুষ্পে লিখা জগতের প্রাচীন দিনের
বিস্মৃত বারতা,

তাই তার গন্ধে ভাসে ক্লান্ত লুপ্ত
লোকলোকান্তের
কান্ত মধুরতা
তাই আজি প্রস্ফুটিত নিবিড় নিকুঞ্জবন হতে
উঠিছে উচ্ছ্বাসি
লক্ষ দিনযামিনীর যৌবনের বিচিত্র
বেদনা,
অশ্রু গান হাসি